শত্রুর চোখ ফাঁকি দিয়ে সামরিক পোশাকে পালিয়ে ছিলেন দলাই লামা!!
তিব্বতের ধর্মগুরু ও সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতা দলাই লামা মানেই শান্তির প্রতীক। কিন্তু আজ থেকে প্রায় ৬৬ বছর আগে, তাঁকে রাতের অন্ধকারে সামরিক পোশাকে পালিয়ে যেতে হয়েছিল নিজের দেশ ছেড়ে। সময়টা ১৯৫৯ সাল, তখন তিব্বত দখল করতে চীনের সেনা শক্তি বাড়িয়ে চলেছে। লাসা শহর তখন কার্যত বোমা ও গুলির আওয়াজে কেঁপে উঠছিল। চারিদিকে বিপদের ঘনঘটা। ঠিক সেই পরিস্থিতিতেই দলাই লামার গোপন পালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
দলাই লামার পালানোর পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বিপজ্জনক। চীনা সেনারা সর্বক্ষণ নজরদারি চালাচ্ছিল। তাঁদের চোখ এড়িয়ে বেরোনো প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু নেতার প্রাণ রক্ষার জন্য সেই ঝুঁকি নিতেই হল। সেই সময়ে দলাই লামা ছিলেন পোটালা প্রাসাদে। রাতের অন্ধকারে, কোনও শোরগোল না করে, সামরিক পোশাক পরে তিনি প্রাসাদ ছাড়েন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কিছু বিশ্বস্ত সঙ্গী এবং নিরপত্তারক্ষীরা। সামরিক পোশাক, সানগ্লাস— সব কিছু এমনভাবে পরা হয়েছিল, যাতে কেউ বুঝতে না পারে তিনিই তিব্বতের শীর্ষ নেতা।
দলাই লামার সেই অজানা যাত্রাপথ ছিল অত্যন্ত কষ্টকর ও বিপজ্জনক। পাহাড় পেরিয়ে, নদী টপকে, দিনের পর দিন চলতে হয়েছে। কোথাও তাঁরা বিশ্রাম নেননি দিনের আলোয়। শুধু রাতের আঁধারেই চলেছেন। কারণ দিনে চললে শত্রুপক্ষ তাঁদের দেখে ফেলতে পারত। এমনকি, আশেপাশে থাকা চীনা সেনাদের ক্যাম্পগুলিকে এড়িয়ে গোপনে গোপনে তাঁরা এগিয়ে যেতে থাকেন।
কয়েকদিনের মাথায় দলাই লামা ও তাঁর সঙ্গীরা পৌঁছে যান ভারত সীমান্তের কাছে। সেই সময় ভারত সরকার তাঁদের আশ্রয় দেয়। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে দলাই লামাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হয়। এরপর থেকে তিনি ভারতের ধরমশালায় থাকছেন, সেখানেই তিব্বতের নির্বাসিত সরকারের মূল কেন্দ্র।
দলাই লামার এই পালানো শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত ঘটনা ছিল না। এটি হয়ে উঠেছিল তিব্বতের রাজনৈতিক ইতিহাসের মোড় ঘোরানো অধ্যায়। কারণ, এরপর থেকেই তিব্বতের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্তর্জাতিক মহলে আওয়াজ ওঠে। বিশ্বের নানা প্রান্তে দলাই লামা শান্তির বার্তা ছড়াতে শুরু করেন।
আজও সেই দিনের ছবি ও কাহিনি ইতিহাসপ্রেমী মানুষদের মনে কৌতূহল জাগায়। কেমন করে দলাই লামা সামরিক পোশাকে চীনা সেনার চোখ ফাঁকি দিয়ে পোটালা প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে গেলেন? কেমন করে সেই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করলেন?
তথ্য বলছে, সেই সময় তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। কারণ, বেশি লোক নিলে চীনা সেনারা সন্দেহ করতে পারত। তাই অত্যন্ত সীমিত সংখ্যক নির্ভরযোগ্য লোকজনকে নিয়ে দলাই লামা নিজের দেশ ছাড়েন। তাঁদের হাতে ছিল না কোনও আধুনিক যোগাযোগের সরঞ্জাম, ছিল শুধু বিশ্বাস আর ধৈর্য।
বছরের পর বছর কেটে গেলেও, দলাই লামার সেই সাহসী সিদ্ধান্ত এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশ ছাড়ার ঘটনাটি আজও ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে আছে। শত্রুর চোখ এড়িয়ে দেশের জন্য, ধর্মের জন্য, নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ত্যাগ করেছিলেন তিনি।