রেশন কার্ড ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সংযুক্তিকরণ!
২৮ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় খাদ্যসচিবের সঙ্গে রাজ্যের খাদ্যসচিবদের বৈঠকে কেন্দ্রীয় সরকার নতুন একটি প্রস্তাব রাখে—এবার রেশন কার্ডের সঙ্গে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সংযুক্ত করা হোক। এই প্রস্তাবে আপত্তি তোলেনি পশ্চিমবঙ্গ সরকার, বরং রাজ্যের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আধারের মাধ্যমেই রেশন কার্ডের মালিকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বেশ কিছু উদ্বেগ দেখা দিয়েছে রেশন ডিলার ও কৃষক সংগঠনের মধ্যে।
রেশন কার্ড ও আধারের সংযুক্তিকরণ: কেন্দ্রের পরিকল্পনা
কেন্দ্রীয় সরকার দীর্ঘদিন ধরেই রেশন কার্ডের আধার সংযুক্তিকরণ নিয়ে কাজ করছে। ইতিমধ্যে আধারের সঙ্গে রেশন কার্ড সংযুক্ত হয়েছে এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রেও এই সংযুক্তিকরণ সম্পন্ন হয়েছে। এবার কেন্দ্র চাইছে, রেশন কার্ডের সঙ্গে সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট যুক্ত করা হোক।
এই উদ্দেশ্যে নতুন রেশন কার্ড বিলির সময় পরিবারের প্রধানের ই-কেওয়াইসি (e-KYC) ফর্ম পূরণ করার সময়ই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য সংগ্রহ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে রাজ্য সরকারের বক্তব্য, এই তথ্য জাতীয় পেমেন্ট কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া (NPCI) থেকেই সংগ্রহ করা সম্ভব। কেননা, ইতিমধ্যেই NPCI-এর মাধ্যমে আধার ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সংযুক্ত হয়েছে। তাই নতুন করে রেশন কার্ডের সঙ্গে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সংযুক্ত করার প্রয়োজন নেই।
খাদ্যসাথী প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ
কেন্দ্রের এই প্রস্তাবের ফলে অনেকেই মনে করছেন, রেশন কার্ডের সঙ্গে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সংযুক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যতে রেশন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানো হতে পারে। বর্তমানে সরকার নগদ ভর্তুকির (Direct Benefit Transfer – DBT) মাধ্যমে খাদ্যশস্য বিতরণের পরিকল্পনা করছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রাজ্য সরকার তাদের খাদ্যসাথী প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ১০ কোটি মানুষকে স্বল্পমূল্যে খাদ্যশস্য সরবরাহ করে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার যদি নগদ ভর্তুকির পথ নেয়, তবে সরাসরি রেশন কার্ডধারীদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে রেশন ব্যবস্থাকে তুলে দেওয়া হতে পারে। এতে মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষ সমস্যার মুখে পড়তে পারেন।
রেশন ডিলার ও কৃষকদের উদ্বেগ
রেশন ডিলারদের সর্বভারতীয় সংগঠন ফেয়ার প্রাইস শপ ডিলারস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বম্ভর বসু মন্তব্য করেছেন, রাজ্য সরকারকে না জানিয়ে কেন্দ্রের নির্দেশ মেনে কিছু প্রশাসনিক কর্তা কাজ করছেন, যা রাজ্যের খাদ্যসাথী প্রকল্পের ভবিষ্যৎকে সংকটে ফেলতে পারে।
তিনি আরও বলেন, “রাজ্যের কিছু আমলা কেন্দ্রের প্রস্তাব মেনে নিয়ে খাদ্যসাথী প্রকল্প বন্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। যদি রেশন কার্ডের সঙ্গে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সংযুক্ত হয়, তবে ভবিষ্যতে ধান কেনার সহায়ক মূল্যের বিষয়েও প্রশ্ন উঠবে।”
কৃষক সংগঠনগুলিও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, নগদ ভর্তুকির পরিবর্তন হলে সহায়ক মূল্যে ধান কেনার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। যদি সরকার সরাসরি ভর্তুকি দেওয়ার পথে যায়, তাহলে বাজারে চাল-গমের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে এবং কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
কেন্দ্রের পরিকল্পনার বিরোধিতায় রাজ্য?
রাজ্যের খাদ্য দফতরের এক শীর্ষ কর্তা জানিয়েছেন, “আমরা কেন্দ্রের এই প্রস্তাবে সরাসরি আপত্তি জানাচ্ছি না, তবে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য NPCI-এর মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব বলে মনে করছি। আলাদা করে রেশন কার্ডের সঙ্গে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট যুক্ত করার কোনও দরকার নেই।”
এদিকে, ২০১৭-১৮ সালে রিজার্ভ ব্যাংক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে আধার সংযুক্তিকরণ বাধ্যতামূলক করেছিল। তবে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলা হয়, যে সব অ্যাকাউন্টে সরকারি ভর্তুকি আসে না, সেগুলোর ক্ষেত্রে এই সংযুক্তিকরণ বাধ্যতামূলক নয়। তবুও প্রায় সব ব্যাঙ্কই এটি চালু রেখেছে। এই কারণেই রাজ্য NPCI-এর তথ্য ব্যবহারের পক্ষপাতী।
শেষ কথা
রেশন কার্ডের সঙ্গে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সংযুক্ত করার সিদ্ধান্তে রাজ্য আপত্তি না জানালেও, এর ভবিষ্যৎ প্রভাব নিয়ে রেশন ডিলার ও কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
✔ এই সংযুক্তির মাধ্যমে কি নগদ ভর্তুকির পথ তৈরি হচ্ছে?
✔ এর ফলে কি খাদ্যসাথী প্রকল্প এবং কৃষকদের সহায়ক মূল্যের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে?
এমন অনেক প্রশ্ন উঠছে, যার উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তবে পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে নীতিগত মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হতে পারে।
ভারতের বদলার জয়: ২৫ বছর পর নিউ জিল্যান্ডকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি রোহিতদের হাতে