রাশিয়ার অর্থনৈতিক সংকট
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক হঠাৎ করেই সুদের হার বাড়িয়ে ২১ শতাংশে পৌঁছেছে। আইএমএফ-এর মতে, দেশটির অর্থনীতি এখন ‘অতি উত্তপ্ত’ পরিস্থিতিতে রয়েছে। মস্কো সরকারের এই পদক্ষেপটি আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বিস্তর আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
২৫ অক্টোবর, ২০২৪-এ রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই সুদের হার বৃদ্ধি করে, যা ২০০৩ সালের পর সর্বোচ্চ। গত সপ্তাহে কাজান শহরে অনুষ্ঠিত ‘ব্রিকস’ সম্মেলনের পরেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, রাশিয়ার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্বের অন্যান্য দেশের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এই সুদের হার বৃদ্ধির কারণ মূলত সরকারকে সেনাবাহিনীর জন্য বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ শুরু করার পর থেকে যুদ্ধের খরচ মেটানোর জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রশাসন ইতিমধ্যেই স্বীকার করেছে যে, যুদ্ধের খরচ মেটাতে সুদের হার বাড়ানোর বিকল্প ছিল না।
সুদের হার বৃদ্ধির ফলে মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব হবে বলে রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশাবাদী। বর্তমানে রাশিয়ায় মূল্যবৃদ্ধির হার ৮.৪ শতাংশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর আগেও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। সম্প্রতি তারা বলেছে, “মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করা হচ্ছে, যা মূল্যবৃদ্ধির হার কমাতে সাহায্য করবে।”
রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক চাপ
রুশ অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন যে, সামনের এক বছরে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব নাও হতে পারে। তারা সুদের হার বৃদ্ধিকে ‘মুদ্রাস্ফীতির কাছে আত্মসমর্পণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এমন অনুমান রয়েছে যে, আগামী বছরেই সুদের হার আরও ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে।
রাশিয়ার বর্তমান আর্থিক অবস্থার মূল্যায়ন করে বিভিন্ন বিশ্লেষক জানিয়েছেন, বাজারে অর্থনীতির অস্থিতিশীলতা রোধ করতে প্রেসিডেন্ট পুতিনকে পুনরায় অর্থনৈতিক সংস্কার চালানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করছে ব্যবসায়ী মহল। তবে, বর্তমান সংকটকে সমাধান করতে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া কতটা সম্ভব হবে তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।
সুদের হার বৃদ্ধির পরেও রাশিয়ায় কর্পোরেট ঋণের গতি কমেনি। মাস কয়েক আগে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) রাশিয়ার জন্য আর্থিক সাহায্য দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল, কিন্তু পশ্চিমী দেশের আপত্তির কারণে সেই উদ্যোগ ভেস্তে গেছে। এই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার অর্থনীতি বেশ চাপের মধ্যে রয়েছে।
বৈশ্বিক প্রভাব এবং ভবিষ্যতের দিক
বিশ্ব অর্থনীতিতে রাশিয়ার অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে দেখা যাচ্ছে, অন্যান্য দেশগুলোতে এই সুদের হার বৃদ্ধির প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে, রুবলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে, যা মুদ্রাস্ফীতির বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পশ্চিমী দেশগুলোর কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার কারণে রাশিয়ার অর্থনীতিতে বিপর্যয় ঘটে চলেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাশিয়ার সরকারকে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে, নাহলে দেশের অর্থনীতি আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে। তারা সুদের হার বৃদ্ধি সহ একাধিক পদক্ষেপের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে, কিন্তু সেই পথের বিপরীতে রাজনৈতিক সমর্থন প্রয়োজন।
এই পরিস্থিতিতে, ভবিষ্যতে কীভাবে রাশিয়ার অর্থনীতি পুনরুদ্ধার হবে, তা নিয়ে সবার নজর থাকবে। দেশটির বর্তমান সংকট ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক বাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে উঠেছে।