মোসাদের ‘অদৃশ্য অস্ত্র’!
ইজ়রায়েলের মোসাদ মানেই বিশ্বের অন্যতম দুর্ধর্ষ গুপ্তচর সংস্থা। আর সেই মোসাদের ইতিহাসে সবচেয়ে সাহসী ও প্রভাবশালী চর হিসেবে যার নাম স্মরণীয়, তিনি হলেন এলি কোহেন। তাঁর জীবন এক রুদ্ধশ্বাস গোয়েন্দা কাহিনি, যার সূত্রপাত মিশরের এক ইহুদি পরিবার থেকে, আর যার অবসান সিরিয়ার রাজধানী দামাস্কাসের জনবহুল স্কোয়্যারে, জনসমক্ষে ফাঁসির মঞ্চে।
১৯২৪ সালে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় জন্ম নেন ইলিয়াহু বেন শল কোহেন। ইহুদি-বিদ্বেষী কট্টর মনোভাবের কারণে তাঁর পরিবার মিশর ছেড়ে চলে এলেও, পড়াশোনার জন্য তিনি সেখানে থেকে যান। পরে ১৯৫৬ সালে ইজ়রায়েলে স্থায়ীভাবে চলে যান এবং সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা শাখায় কাজ শুরু করেন। বহুবার আবেদন করেও মোসাদে প্রবেশ করতে পারেননি, কিন্তু ভাগ্য ঘুরল ১৯৬০ সালে— এক উচ্চঝুঁকিপূর্ণ মিশনের জন্য ডাক পড়ল তাঁর।
প্রথমে আর্জেন্টিনায় সিরীয় ব্যবসায়ী ‘কামিল আমেন থাবেত’ পরিচয়ে ছদ্মবেশে কাজ শুরু করেন কোহেন। সেখানে সিরীয় উচ্চপদস্থদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন। বিলাসবহুল পার্টি, মদ, জুয়া, সৌন্দর্যের মোড়কে মোসাদের টাকা খরচ করে তিনি আদায় করতেন সিরিয়ার গোপন তথ্য। পরে দামাস্কাসে পাকাপাকি ঘাঁটি গাড়েন এবং সিরিয়ার প্রশাসন ও সেনার সঙ্গে হয়ে ওঠেন অন্দরের মানুষ।
কোহেনের বিশেষত্ব ছিল, তিনি শুধু তথ্য সংগ্রহ করতেন না— রাজনৈতিক প্রভাবও তৈরি করতেন। তাঁর একটি প্রস্তাব ছিল গোলান মালভূমিতে সৈনিকদের জন্য ছায়া দেওয়া গাছ লাগানোর। পরে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে সেই গাছগুলিই ইজ়রায়েলি বাহিনীর জন্য হয়ে ওঠে নিশানা! এমন বহু কৌশলে সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনা ইজ়রায়েলের হাতে পৌঁছে দিতেন কোহেন।
তাঁর মিশনের চার বছরে, ইজ়রায়েল সিরিয়ার রণকৌশলের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ১৯৬৫ সালে সিরীয় গোয়েন্দারা কোহেনের রেডিয়ো ট্রান্সমিশনের সূত্র ধরে তাঁকে গ্রেফতার করে। অত্যাচার চালিয়েও কোনও তথ্য আদায় করতে পারেনি। আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
১৮ মে ১৯৬৫, দামাস্কাসের মার্জিস স্কোয়্যারে ১০ হাজার মানুষের ভিড়ে প্রকাশ্য ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় কোহেনকে। গলায় ঝোলানো হয়েছিল একটি প্ল্যাকার্ড— “এই ব্যক্তি ইজ়রায়েলের গুপ্তচর, সিরিয়ার বহু ক্ষতি করেছে।” তাঁর দেহও ফেরত দেয়নি সিরিয়া, কেবল একটি চিঠি পৌঁছেছিল পরিবারের হাতে।
এলি কোহেনের গল্প শুধু এক গুপ্তচরের জীবনগাথা নয়, বরং গোয়েন্দা যুদ্ধের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। মোসাদের গর্ব, সিরিয়ার আতঙ্ক, আর গোটা বিশ্বের কাছে দুঃসাহসিকতার প্রতীক হয়ে আছেন তিনি আজও।