মালদহে লাস ভেগাস! মোকাতিপুরে জুয়াখেলার ঐতিহ্যবাহী মেলা

গ্রামের নাম মোকাতিপুর। এটি মালদহ জেলার পুরাতন অংশের একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রাম। প্রতি বছর মূলাষষ্ঠীর তিথিতে এই গ্রামে বসে এক অদ্ভুত মেলা, যা একদিনের জন্য পুরো এলাকাটিকে রূপান্তরিত করে দেয় এক…

December 7, 2024
1 min read

গ্রামের নাম মোকাতিপুর। এটি মালদহ জেলার পুরাতন অংশের একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রাম। প্রতি বছর মূলাষষ্ঠীর তিথিতে এই গ্রামে বসে এক অদ্ভুত মেলা, যা একদিনের জন্য পুরো এলাকাটিকে রূপান্তরিত করে দেয় এক উৎসবের নগরীতে। যদিও এখানে লাস ভেগাসের মতো ঝাঁকজমক নেই, তবুও আবেগে ভরপুর এক দিন কাটায় পুরো গ্রাম। স্থানীয়দের কাছে এই মেলাটি শুধুমাত্র এক বিনোদনের উৎস নয়; বরং এটি তাদের প্রাচীন লোকাচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ইতিহাস ও লোকাচারের পটভূমি

মোকাতিপুরের এই জুয়ার মেলার উৎপত্তি ঘিরে রয়েছে এক জনপ্রিয় কিংবদন্তি। কথিত আছে, ‘মনসামঙ্গল কাব্য’ অনুযায়ী বেহুলা যখন তার স্বামী লখিন্দরের দেহ ভেলায় ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন এক জুয়াড়ি জুয়া খেলে সর্বস্ব হারিয়ে নদীর ধারে বসে কাঁদছিলেন। বেহুলা তাকে সোনার চুড়ি দিয়ে জুয়া খেলার জন্য উৎসাহিত করেন। তার কথামতো জুয়াড়ি সেই চুড়ি দিয়ে খেলেন এবং পুনরায় নিজের সম্পত্তি ফিরে পান। এই ঘটনার পর থেকেই মোকাতিপুরে মূলাষষ্ঠীর তিথিতে জুয়ার মেলা বসে আসছে।

একদিনের ভেগাস

মূলাষষ্ঠীর দিন সকাল থেকেই শুরু হয় মেলার প্রস্তুতি। সারা গ্রাম একত্রিত হয়ে সাজে উৎসবের সাজে। শুধু গ্রামের লোকজনই নয়, মালদহের অন্যান্য এলাকা থেকে, এমনকি বিহার, ঝাড়খণ্ড এবং অসম থেকেও বহু মানুষ এই মেলায় অংশ নিতে আসেন। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনও এই মেলার গুরুত্ব অনুধাবন করে নিরাপত্তা বজায় রাখতে সক্রিয় থাকে। পুলিশের উপস্থিতিতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই মেলা সম্পন্ন হয়।

সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি

এই মেলায় জুয়া খেলা সামাজিক বা আইনগত দৃষ্টিতে অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় না। বরং এটি স্থানীয়দের কাছে শুভ ও ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃত। মহিলারাও এই মেলায় সমান অংশগ্রহণ করেন, যা সচরাচর গ্রামীণ সমাজে দেখা যায় না। স্থানীয় মহিলারা বিশ্বাস করেন, এই মেলায় জুয়া খেললে সারা বছর সংসারে সুখ ও সমৃদ্ধি বজায় থাকে। নিঃসন্তান মহিলারা সন্তান লাভের আশায় এই মেলায় অংশ নেন।

হেমলতা চক্রবর্তী নামে এক গৃহবধূ জানান, “এই মেলায় সামান্য পয়সার জুয়া খেলেছি এবং লাভও হয়েছে। এতে আমি খুবই খুশি।” অন্য এক স্থানীয়, দীপিকা কর্মকার বলেন, “এই দিনটির জন্য আমরা সারা বছর অপেক্ষা করি। জুয়া খেলার জন্য কোনও বাধা নেই। এটা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ।”

মেলায় জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতি

মোকাতিপুরের এই ঐতিহ্যবাহী মেলায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অংশগ্রহণও লক্ষণীয়। পুরাতন মালদহ পুরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর স্বপ্না হালদার বলেন, “বিয়ের পর থেকে প্রতি বছর এই মেলায় আসছি। এই মেলায় মহিলারা জুয়া খেলেন, যা আমাদের এলাকার এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য। সকলে মিলে আমরা এই দিনটি উপভোগ করি।”

বর্তমান বছরের মেলার চিত্র

এ বছরও মূলাষষ্ঠীর তিথিতে মোকাতিপুরে জুয়ার মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মেলা চলে। মেলার এক কোণে ষষ্ঠীর পুজোর আয়োজন করা হয়, যেখানে স্থানীয় ও দূরবর্তী এলাকার মানুষ পুজো দিতে আসেন। পুজোর পরপরই শুরু হয় জুয়া খেলার ধুম। পুরুষ-মহিলারা একত্রে খেলায় মেতে ওঠেন। পুরো এলাকায় যেন উৎসবের বাতাবরণ বিরাজ করে।

ঐতিহ্যের সংরক্ষণ

যদিও এই মেলায় জুয়া খেলার বিষয়টি নিয়ে বাইরে থেকে কেউ কেউ সমালোচনা করেন, তবে স্থানীয়দের কাছে এটি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতীক। তারা বিশ্বাস করেন, এই মেলা তাদের সমাজের একতা ও সহযোগিতার পরিচয় বহন করে। স্থানীয় প্রশাসনও এই মেলার আয়োজনকে সমর্থন করে এবং তা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার দায়িত্ব নেয়।

মোকাতিপুরের এই জুয়ার মেলা শুধু একটি লোকাচার নয়, এটি তাদের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক। বছরে একদিনের জন্য হলেও এই মেলা গ্রামবাসীদের জীবনে আনন্দ, আশা ও ঐক্যের বার্তা বয়ে আনে।

Follow us on Google News Get real-time updates & exclusive sports coverage
Follow

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *