আলিয়া থেকে শুভশ্রী
সন্তান জন্ম মানেই শুধুই আনন্দ নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে এক গভীর মানসিক ও শারীরিক পরিবর্তনের অধ্যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন’— সেই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন বহু নতুন মা। বাইরে থেকে ঝলমলে মনে হলেও, বলিউড ও টলিউডের প্রথম সারির অভিনেত্রীদের জীবনও এর ব্যতিক্রম নয়। সম্প্রতি ঋচা চড্ঢার বক্তব্য ফের এই বিষয়টিকে সামনে এনেছে— মা হওয়ার পরে কাজ পাওয়া কি সত্যিই কঠিন হয়ে যায়?
শিশুর জন্মের পর নারীর শরীরে হরমোনের বড়সড় ওঠানামা হয়। তার সঙ্গে যোগ হয় অনিদ্রা, শারীরিক ক্লান্তি এবং সর্বোপরি এক নতুন দায়িত্বের চাপ। অনেক ক্ষেত্রেই এই সব মিলিয়ে তৈরি হয় অবসাদ। সন্তান জন্মের পর চারপাশের প্রত্যাশাও বদলে যায়। একজন নারী তখন শুধু অভিনেত্রী নন, তিনি আগে মা— এই ধারণা অনেক সময়ই কর্মক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে।
আলিয়া ভট্ট: দ্রুত ফেরা, ভিতরের লড়াই
আলিয়া ভট্ট মেয়ের জন্মের মাত্র সাত মাসের মাথায় কাজে ফিরেছিলেন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, তিনি খুব সহজেই সব সামলে নিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবটা ততটা সরল ছিল না। এক সাক্ষাৎকারে আলিয়া জানিয়েছেন, মা হওয়ার পরে তিনি প্রবল উদ্বেগে ভুগতেন— ঠিকভাবে সন্তান প্রতিপালন করতে পারছেন কি না, অন্যেরা তাঁকে কী ভাবে দেখছে, এই সব প্রশ্ন সারাক্ষণ মাথায় ঘুরত। সেই মানসিক চাপ সামলাতে তিনি নিয়মিত থেরাপির সাহায্য নেন। আলিয়ার কথায়, মাতৃত্ব শেখার কোনও শেষ নেই, প্রতিদিনই নতুন কিছু শেখার প্রয়োজন হয়।
রাধিকা আপটে: শর্তের সঙ্গে কাজের সিদ্ধান্ত
২০২৪ সালে মা হন রাধিকা আপটে। মাতৃত্ব তাঁর জীবনে পরিকল্পনার অংশ ছিল না। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় শরীরের পরিবর্তন ও যন্ত্রণা তাঁকে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত করেছিল। সন্তান জন্মের পর তিনি বুঝতে পারেন, আগের মতো নিরবচ্ছিন্ন ভাবে কাজ করা আর সম্ভব নয়। তাই রাধিকা স্পষ্ট জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে কাজের চুক্তিতে বিশেষ শর্ত রাখবেন। তাঁর প্রশ্ন— সিনেমার সেটে এত নারী কাজ করলেও, তাঁদের মধ্যে ক’জন মা হয়ে কাজ চালিয়ে যেতে পারেন? এই প্রশ্নই তুলে ধরে ইন্ডাস্ট্রির কাঠামোগত বৈষম্য।
শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়: নিজেকে গড়ে তোলার লড়াই
টলিউডে শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায় প্রথমবার মা হন ২০২০ সালে। পুত্র ইউভানের জন্মের পর তিনি নিজেও পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনের মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন। ওজন বৃদ্ধি, শরীরের গড়নের পরিবর্তন তাঁকে মানসিক ভাবে ভেঙে দিয়েছিল। তবে থেরাপির বদলে যোগব্যায়াম ও আত্মবিশ্বাসই ছিল তাঁর অস্ত্র। পরে দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হলেও, মাতৃত্বকে কখনওই নিজের কেরিয়ারের বাধা হতে দেননি শুভশ্রী।
ঋচা চড্ঢা: বাধ্য হয়ে কাজে ফেরা
ঋচা চড্ঢা ২০২৪ সালে মা হন। সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে এক বছরের মেয়েকে কোলে নিয়ে শুটিংয়ের ছবি পোস্ট করে তিনি সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, মা হওয়ার পরে কাজে ফেরার জন্য যে সময় দরকার, ইন্ডাস্ট্রি তা দিতে রাজি নয়। কাজ হারানোর ভয়েই শরীর ও মনের প্রস্তুতি না থাকা সত্ত্বেও তাঁকে সেটে ফিরতে হয়েছে।
কল্কি কেকলাঁ: কাজ কমানোর সচেতন সিদ্ধান্ত
কল্কি কেকলাঁ মাতৃত্বকে এক গভীর আত্মত্যাগের অধ্যায় বলে মনে করেন। তাঁর মতে, প্রসবের পর মায়ের শরীর পুরোপুরি সন্তানের জন্য কাজ করে। সেই কারণেই তিনি সন্তানের জন্মের পর কাজ অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছেন এবং বেছে নিয়েছেন মঞ্চাভিনয়।
এই তালিকায় রয়েছেন কোয়েল মল্লিক, কিয়ারা আডবাণী, দীপিকা পাড়ুকোন, ক্যাটরিনা কইফের মতো নতুন মায়েরাও। কেউ দ্রুত কাজে ফিরেছেন, কেউ আবার সময় নিচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়— যেখানে অভিনেতারা বাবা হওয়ার পরও নির্বিঘ্নে কাজ চালিয়ে যান, সেখানে মায়েদের ক্ষেত্রে এই লড়াই কেন এত কঠিন? মাতৃত্বের পরে কাজ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ভারসাম্য— এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই এখন সময়ের দাবি।