মাঝসমুদ্রে রক্ষা করেছে মনের জোর
২০১৮ সালে, ‘গোল্ডেন গ্লোব রেস’-এ অংশ নেওয়া অভিলাষ টমি, এক ছোট্ট ডিঙি নিয়ে বিশ্ব পরিক্রমা করার সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন। তবে, এ দুর্ঘটনাটি শুধুমাত্র শারীরিক নয়, মানসিক অটুটতার এক বড় পরীক্ষা ছিল তার জন্য। দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের সবচেয়ে দূরবর্তী স্থানে যখন সামুদ্রিক ঝড়ের ধাক্কায় ডিঙি প্রায় উল্টে যাচ্ছিল, তখন ক্যাপ্টেন অভিলাষ টমি ছিলেন একমাত্র আরোহী। মাস্তুল থেকে ঝুলে থাকা অবস্থায় তিনি একসময় ডিঙির ডেকের উপরে পড়ে যান। শারীরিকভাবে মারাত্মকভাবে আহত হলেও, নিজের অদম্য মানসিক শক্তির জোরে ৩.৫ দিন একাকী যুদ্ধ করেন। অবশেষে, একটি ফরাসি মাছ ধরার নৌকা তাকে উদ্ধার করে এবং পরবর্তী সময়ে মেরুদণ্ডে দু’টি টাইটেনিয়াম রড বসানো হয়।
এই কঠিন পরিস্থিতি সম্পর্কে অভিলাষ টমি বলেন, ‘‘আমি ধ্যান এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের দিকে মনোযোগ দিয়েছিলাম। আতঙ্কিত না হয়ে, মানসিকভাবে দৃঢ় থাকার চেষ্টা করেছি। যদি সাহায্য তাড়াতাড়ি না-ও আসত, তবে আমি সেই পরিস্থিতিকে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলাম।’’ তার এই কথায় স্পষ্ট, যে জীবনের কঠিন পরিস্থিতি কখনও না কখনও আসবেই, তবে তার মোকাবিলা করতে হলে মনকে শক্ত এবং স্থিতিশীল রাখতে হবে।
অভিলাষ টমি ২০২২ সালে আবারও ‘গোল্ডেন গ্লোব রেস’-এ অংশ নেন। তার আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং নিজের শরীর ও মনের দৃঢ়তা নিয়ে তিনি দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। সে সময় তিনি নানা সমস্যার মুখোমুখি হন, যেমন অপ্রতুল পানীয় জল, সামুদ্রিক ঝড়, খাদ্য সঙ্কট এবং নৌকার অটো-পাইলটের খারাপ অবস্থা। তবে, সব বাধা অতিক্রম করে, ২৩৬ দিন পর তিনি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছান।
অভিলাষের মতে, সমুদ্রে একাকী জীবন চালানোর জন্য নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। ‘‘ধৈর্য এবং ধ্যান আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। জীবনে ভয় থাকা দরকার, তবে সেটা সঠিক পরিমাণে হতে হবে।’’ এই মানসিকতা তাকে তার অভিযানে সহায়তা করেছে, যেখানে সবার কাছে তাকে একজন একাধিকবার হতাশ হতে দেখা যায়নি।
এমন এক যাত্রার পর, অভিলাষ টমি নিজেকে আরও বৃহত্তর উদ্যোগে যুক্ত করেছেন। বর্তমানে তিনি ইসরো-এর ‘গগনযান’ অভিযানে সাহায্য করছেন, যেখানে মহাকাশচারীদের সমুদ্রে প্রত্যাবর্তনের সময় কীভাবে আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে, সে বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, ‘‘ভারতীয় নৌসেনার দুই মহিলা অফিসারকে আমি মেন্টর হিসেবে সাহায্য করেছি। তাঁদের সমুদ্রপথে বিশ্ব পরিক্রমার আগে তাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে সাহায্য করেছি।’’
এছাড়াও, অভিলাষ মনে করেন, দেশের সরকারের উচিত অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের পরিকাঠামো এবং উদ্ধারকাজ উন্নত করা। ‘‘আমাদের সাত হাজার কিলোমিটার উপকূল এলাকা রয়েছে, যেখানে সমুদ্রের জল গরম। এই সুবিধা অনেক দেশেই নেই।’’ তিনি মনে করেন, এমন ধরনের অভিযানে অংশ নিয়ে ভারতীয় শিশুর চরিত্র গঠন হতে পারে, যা দেশের ভবিষ্যত উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অভিলাষ টমির মতো নাবিকের গল্প আমাদের শেখায়, যে সংকটের মাঝে সাহসিকতা এবং মানসিক দৃঢ়তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তার জীবন সংগ্রামের মাধ্যমে, তিনি প্রমাণ করেছেন যে প্রকৃত শক্তি শারীরিক নয়, বরং মনের জোরে নিহিত।