মহাশূন্যে নতুন বিস্ময়!
ব্রহ্মাণ্ডের বিশাল রহস্যময়তার মধ্যে আরও এক বিস্ময়ের খোঁজ পেলেন বিজ্ঞানীরা। এবার মহাশূন্যে চিহ্নিত হল এক বিরাট মহাজাগতিক কাঠামো— যার নাম ‘কিপু’ (Kipú)। এটি কেবল একটি নয়, বরং পাঁচটি সুপারস্ট্রাকচারের মধ্যে সবচেয়ে বড়, যা ছড়িয়ে রয়েছে প্রায় ১৩০ কোটি আলোকবর্ষ জুড়ে। কেবল এই এক কাঠামোতেই রয়েছে ৬৮টি ছায়াপথপুঞ্জ এবং অগণিত গ্যালাক্সি, যার তুলনায় আকাশগঙ্গাও যেন এক বিন্দু।
কিপু কী এবং এর গঠন কেমন?
মহাজাগতিক গঠনে, এক বা একাধিক ছায়াপথ একত্র হয়ে গঠন করে ছায়াপথপুঞ্জ বা গ্যালাক্সি ক্লাস্টার। অনেকগুলি ছায়াপথপুঞ্জ আবার মিলে তৈরি করে মহাকাঠামো বা সুপারস্ট্রাকচার। এই কিপু তেমনই এক গিঁটের মতো জটিল ও প্যাঁচালো গঠনবিশিষ্ট বিশাল মহাকাঠামো, যার চেহারা কৃত্রিম উপগ্রহের এক্স-রে টেলিস্কোপে প্রথম ধরা পড়ে। এর নামকরণ করা হয়েছে ইনকা সভ্যতার ‘কিপু’ দড়ির অনুপ্রেরণায়—যা গিঁট দিয়ে তথ্য রেকর্ড রাখার জন্য ব্যবহৃত হত।
বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব ৪২ থেকে ৮১ কোটি আলোকবর্ষের মধ্যে। এই কাঠামোর ভেতর রয়েছে প্রচুর অজানা গ্যালাক্সি, ছায়াপথপুঞ্জ এবং অদৃশ্য বস্তু ‘ডার্ক ম্যাটার’। যেহেতু এই বস্তু আলো বা বিকরণ গ্রহণ বা প্রতিফলন করে না, তাই সরাসরি দেখা যায় না। তবুও, এর মহাকর্ষজ প্রভাব থেকে বিজ্ঞানীরা এর অস্তিত্ব বুঝতে পারেন।
আকাশগঙ্গার থেকে কতটা বড় ‘কিপু’?
আমাদের ছায়াপথ ‘মিল্কি ওয়ে’ বা ‘আকাশগঙ্গা’ একটি মাঝারি গ্যালাক্সি, যা ‘ভার্গো’ নামক একটি বৃহত্তর কাঠামোর অংশ। ভার্গো আবার যুক্ত রয়েছে ‘লানিকিয়া’ নামক এক বিশাল সুপারস্ট্রাকচারে। কিন্তু কিপু তার থেকেও আড়াই গুণ বড়। ‘লানিকিয়া’র বিস্তার ৫২ কোটি আলোকবর্ষ, আর ‘কিপু’র ব্যাপ্তি ১৩০ কোটি আলোকবর্ষ। এর মধ্যে অনায়াসে ১৩ হাজারটিরও বেশি ছায়াপথের বসবাস সম্ভব, যা এই কাঠামোকে মহাবিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম গঠনে পরিণত করেছে।
কে খুঁজে পেল এই ‘মহাদানব’?
জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট-এর বিজ্ঞানী হ্যান্স বোরিঙ্গার এবং তাঁর দলের নেতৃত্বে চলা গবেষণায়, ‘রোস্যাট এক্স-রে’ কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে কিপুর খোঁজ মেলে। শুধু কিপু নয়, সেই জরিপে আরও চারটি বিশাল মহাজাগতিক কাঠামোরও সন্ধান মেলে— সার্পেন্স-কোরোনা বোরিয়ালিস, হারকিউলিস, স্কাল্পটর-পেগাসাস এবং শ্যাপলি। পূর্বে ‘শ্যাপলি’কে সবচেয়ে বড় কাঠামো বলা হলেও, এখন তার আসন দখল করেছে ‘কিপু’।
কতটা গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার?
এই পাঁচটি কাঠামোর মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে মোট ১৮৫টি ছায়াপথপুঞ্জ। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, মহাবিশ্বের মোট ছায়াপথপুঞ্জের প্রায় ৪৫ শতাংশই রয়েছে এই পাঁচ সুপারস্ট্রাকচারে। অর্থাৎ, সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের প্রায় ১৩ শতাংশ এলাকা দখল করে আছে এই দানবীয় কাঠামোগুলি।
উপসংহার
‘কিপু’র আবিষ্কার শুধু মহাকাশবিজ্ঞান নয়, ব্রহ্মাণ্ডের গঠন এবং বিবর্তন নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে গবেষকদের। এই বিশাল গঠন, এর জটিলতা এবং মধ্যে থাকা অজানা উপাদান আমাদের মহাবিশ্বকে আরও গভীরভাবে বোঝার নতুন দরজা খুলে দিচ্ছে। মহাশূন্য যতই অনন্ত হোক না কেন, মানুষের অনুসন্ধান থেমে নেই। ‘কিপু’ তারই প্রমাণ—এখনও কত অজানাকে জানা বাকি!