ভূমিকম্পপ্রবণ হিমালয়ে ‘জল বোমা’!
ভারত ও চিনের মধ্যে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক উষ্ণতার ইঙ্গিত মিললেও হিমালয়ের বুকেই যেন নতুন করে অশান্তির বীজ বপন করছে বেজিং। অরুণাচল প্রদেশের একেবারে গা ঘেঁষে, তিব্বতে ব্রহ্মপুত্র নদীর উপর বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও বাঁধ নির্মাণে নেমেছে চিন। বিশেষজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা— এই প্রকল্প শুধু পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য এক ভয়ঙ্কর ‘জল বোমা’ হয়ে উঠতে পারে।
চিনে ব্রহ্মপুত্রের নাম ইয়ারলুং সাংপো। তিব্বতের ‘গ্রেট বেন্ড’ এলাকায়, যেখানে নদী প্রায় ২ হাজার মিটার নিচে হঠাৎ নামছে, সেখানেই এই বিশাল বাঁধ তৈরির পরিকল্পনা। প্রকল্পটি সম্পূর্ণ হলে চিন বছরে প্রায় ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে— যা তাদের থ্রি গর্জেস বাঁধের থেকেও কয়েক গুণ বেশি। এই লক্ষ্যেই প্রায় ১৬ হাজার ৮০০ কোটি ডলার খরচ করতে প্রস্তুত বেজিং।
কিন্তু উদ্বেগের জায়গা অন্যত্র। এই অঞ্চলটি ভূমিকম্পপ্রবণ। মাত্র গত বছরই তিব্বতে ৬.৮ মাত্রার ভূমিকম্পে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এমন এলাকায় বিশাল বাঁধ তৈরি হলে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা। বর্ষাকালে যদি হঠাৎ বিপুল জল ছাড়া হয় বা দুর্ঘটনা ঘটে, তা হলে সিয়াং হয়ে অসম ও অরুণাচলের বিস্তীর্ণ এলাকা মুহূর্তে প্লাবিত হতে পারে।
অরুণাচলের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু প্রকাশ্যেই এই প্রকল্পকে ভারতের জন্য ‘জল বোমা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর আশঙ্কা, চিন চাইলে জল আটকে রেখে শুষ্কতা তৈরি করতে পারে, আবার রাজনৈতিক চাপের সময় হঠাৎ জল ছেড়ে ভয়াবহ বন্যাও ঘটাতে পারে। অতীতেও এমন অভিযোগ উঠেছে। ২০১৭ সালে অসমে হঠাৎ বন্যার সময় কোনও আগাম সতর্কতা দেয়নি চিন। তার আগেও মেকং নদীর জলপ্রবাহ আচমকা কমিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিকে বিপাকে ফেলেছিল বেজিং।
ভারতের আর এক বড় দুর্বলতা হল— আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে কোনও আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সই করেনি চিন। ফলে জলপ্রবাহ বদল বা ক্ষতির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আইনি চাপ তৈরি করা ভারতের পক্ষে কঠিন। বেজিং অবশ্য দাবি করছে, এই প্রকল্প পরিবেশবান্ধব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়ক। তাদের মতে, এতে কয়লার উপর নির্ভরতা কমবে এবং নিম্ন অববাহিকায় বন্যাও নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কিন্তু এই আশ্বাসে পুরোপুরি ভরসা রাখতে পারছেন না নয়াদিল্লি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এত কঠিন ভূপ্রকৃতি ও ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় বাঁধ নির্মাণ চিনের পক্ষেও বিপজ্জনক হতে পারে। প্রকৃতি এখানে শেষ কথা বলতে পারে— এবং সেই ‘মার’ শুধু ভারতের নয়, চিনের জন্যও ভয়াবহ খেসারত ডেকে আনতে পারে।
ভারতের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে এবং জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে। তবে কূটনীতিকদের ধারণা, আপাতত সরাসরি সংঘাতের পথে হাঁটবে না ভারত। কিন্তু হিমালয়ের এই নীরব নির্মাণ যে দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশীর সম্পর্কে নতুন করে চাপ তৈরি করছে, তা স্পষ্ট।