ভিন্গ্রহে প্রাণের স্বপ্নে জল!
মহাকাশে প্রাণের খোঁজ যেন বিজ্ঞানের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অভিযানগুলির একটি। আর সেই কল্পনার জগতে যেন হঠাৎই আশার আলো জ্বেলে দিয়েছিল সৌরজগতের বাইরে একটি গ্রহ— ‘কে২-১৮বি’। ২০২৩ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক দাবি করেছিলেন, এই গ্রহে এমন একটি রাসায়নিক উপাদান মিলেছে, যা পৃথিবীতে শুধুমাত্র সামুদ্রিক অনুজীবদের মাধ্যমেই উৎপন্ন হয়। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছিল চাঞ্চল্য— তবে কি শেষ পর্যন্ত ভিন্গ্রহে প্রাণের সন্ধান মিলল?
কিন্তু সেই আশায় এবার জল ঢেলে দিল নতুন গবেষণা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো ও অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন— কে২-১৮বি গ্রহে প্রাণের উপস্থিতির কোনও প্রমাণ মেলেনি।
প্রাণের সম্ভাবনা কোথা থেকে তৈরি হয়েছিল?
কে২-১৮বি গ্রহটি পৃথিবী থেকে ১২০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত, এবং এটি একটি এক্সোপ্ল্যানেট— অর্থাৎ এমন এক গ্রহ, যা আমাদের সৌরজগতের বাইরের কোনও নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে। ২০২৩ সালে ‘জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ’-এর মাধ্যমে প্রাপ্ত ডেটা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছিলেন, ওই গ্রহের বায়ুমণ্ডলে রয়েছে হাইড্রোজেন, কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন এবং আরও একটি রাসায়নিক— ডাইমিথাইল সালফাইড (DMS)।
এই DMS সাধারণত পৃথিবীতে সামুদ্রিক ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন তৈরি করে। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে বাঁচতে তারা এই রাসায়নিক তৈরি করে আত্মরক্ষা করে। তাই বিজ্ঞানীদের ধারণা হয়েছিল, যেহেতু কে২-১৮বি-র বায়ুমণ্ডলে DMS-এর উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে, তা হলে সেখানে প্রাণও থাকতে পারে।
কী বলছে নতুন গবেষণা?
অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক লুইস ওয়েলব্যাঙ্কস এবং তাঁর দল সম্প্রতি সেই পূর্ববর্তী তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়ে দিয়েছেন— DMS-এর কোনও সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায়নি। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ থেকে পাওয়া নিয়ার ও মিড-ইনফ্রারেড তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যদিও কিছু গ্যাসীয় অণু উপস্থিত রয়েছে, কিন্তু DMS থাকার সম্ভাবনাকে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
শুধু তাই নয়, বিজ্ঞানীদের দাবি, গ্রহটির পরিবেশে আলো ও তাপের সংস্পর্শে প্রাকৃতিক রাসায়নিক বিক্রিয়া থেকেও ওই অণুর মতো উপাদান তৈরি হতে পারে। ফলে এই গ্যাসের অস্তিত্ব মানেই প্রাণের উপস্থিতি নয়।
আশার পর নিরাশা, তবু গবেষণা চলবে
গবেষক রাফায়েল লুক জানাচ্ছেন, কে২-১৮বি পৃথিবীর তুলনায় আকারে প্রায় আড়াই গুণ বড় এবং এই গ্রহ তার নিজস্ব নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে। যেহেতু এত দূর থেকে সরাসরি কোনও তথ্য পাওয়া যায় না, তাই প্রতিফলিত আলো, তরঙ্গদৈর্ঘ্য ও রাসায়নিক বিশ্লেষণের উপর নির্ভর করেই গবেষণা চলছে।
এক সময় ধারণা করা হচ্ছিল, কে২-১৮বি-র পৃষ্ঠে হয়তো বিশাল জলাধার রয়েছে এবং তাতেই প্রাণের উৎস হতে পারে। কিন্তু সেই আশাও আপাতত নস্যাৎ। গবেষকেরা বলছেন, বহির্জাগতিক প্রাণের সম্ভাবনা এখনও খুবই অনিশ্চিত— নতুন কোনও প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত এটি কেবল বিজ্ঞানসম্মত কল্পনা বলেই ধরে নেওয়া হবে।
ভবিষ্যতে মহাকাশ গবেষণার প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে, হয়তো কোনও একদিন সেই বহু প্রতীক্ষিত প্রশ্নের উত্তর মিলবেই— পৃথিবীর বাইরেও কি কোথাও প্রাণ আছে?
৩৫ হাজার ফুটে ও আরামেই ভেসে থাকুন! দীর্ঘ উড়ানে আরাম পাওয়ার ৭টি সহজ টিপস