বুবি ট্র্যাপ
১৯ বছর আগে রাশিয়ার অত্যন্ত কুখ্যাত চেচেন বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা শামিল বাসায়েভকে ট্রাক বিস্ফোরণে নিকেশ করে মস্কোর গুপ্তচর সংস্থা। ওই ঘটনার পর থেকে তাঁর নাম ‘রাশিয়ার বিন লাদেন’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তিনি আল কায়দার নেতা ওসামা বিন লাদেনের মতোই সন্ত্রাসী হামলার মাধ্যমে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর ওপর একের পর এক আক্রমণ চালিয়েছিলেন। ২০০৬ সালে এক বিস্ফোরণে তাঁর মৃত্যু হয়, কিন্তু মস্কো এখনো তার স্মৃতি থেকে বেরোতে পারেনি।
এবছরের জানুয়ারি মাসে, রুশ সরকারি সংবাদ সংস্থা স্পুটনিক ইন্ডিয়া ১৯ বছর আগে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনার কথা মনে করিয়ে একটি পোস্ট শেয়ার করেছে। এই পোস্টে ক্রেমলিনের গুপ্তচর সংস্থা এফএসবি (ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিস) কীভাবে শামিল বাসায়েভকে নিকেশ করেছিল, সেই সম্পর্কেও বিশদ বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এই পোস্টে ব্যবহৃত ছবি এবং বার্তা যে কোনো সাধারণ বিষয় নয়, তা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। সুতরাং, প্রশ্ন উঠছে—মস্কো কী বার্তা দিতে চাইছে এই পুরনো ঘটনার স্মরণ করে?
বুবি ট্র্যাপ শামিল বাসায়েভ: একজন শত্রু ও বিপ্লবী
শামিল বাসায়েভ চেচেন স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ১৯৬৫ সালে চেচনিয়ার দিশেন ভেদেনো গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। শামিলের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে আসছিল। যেহেতু তিনি মস্কোর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন, তাঁর জীবনেও বিতর্ক এবং সংগ্রাম ছিল। ১৯৯১ সালে চেচেনিয়া রাশিয়া থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করার পর বাসায়েভ এক দাপুটে নেতায় পরিণত হন। ১৯৯৬ সালে রাশিয়ার সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে তিনি গ্রোজনি পুনরুদ্ধার করেন।
তবে তার খ্যাতি শুধু চেচেনিয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল না। ২০০৪ সালে বাসায়েভ এবং তাঁর দল রাশিয়ার বেসলান এলাকায় একটি স্কুলে সন্ত্রাসী হামলা চালায়, যেখানে ৩৩০ জনের মৃত্যু হয়। রাশিয়ার বিপক্ষে একের পর এক হামলা চালানোর পর তাকে ‘রাশিয়ার বিন লাদেন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

‘বুবি ট্র্যাপ’ ও শামিলের মৃত্যু
শামিল বাসায়েভের বিরুদ্ধে রাশিয়ার বিভিন্ন অভিযোগ ছিল, যার মধ্যে অপহরণ, নির্বিচারে হত্যা এবং অস্ত্র পাচার অন্যতম। রাশিয়া তাকে ধরতে অনেকবার চেষ্টা করেছে, ২০০৪ সালে বিমান হামলায় তাঁকে মারার চেষ্টা হলেও সফল হয়নি তারা। কিন্তু শেষপর্যন্ত ২০০৬ সালে রাশিয়ার গুপ্তচর সংস্থা তাকে হত্যা করতে সফল হয়। শামিলকে খুন করতে মস্কোর এফএসবি তাকে এক ফাঁদে ফেলেছিল। একটি ট্রাকের ভিতরে ‘বুবি ট্র্যাপ’ পাতা হয়, এবং সেখানে এক বিস্ফোরণ তাকে জীবন শেষ করে দেয়।
পুলিশের তদন্তে জানা যায় যে, শামিল এই ট্রাকের মধ্যে ছিল যখন বিস্ফোরণ ঘটে। কিছু সূত্র জানিয়েছে, তার মৃত্যু একটি দুর্ঘটনা ছিল, কিন্তু মস্কো সরকারের মতে এটি ছিল একটি কৌশলগত হামলা। এক সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছিল যে, এই হত্যার জন্য মস্কো পাঁচ লক্ষ ডলার প্রদান করেছিল। শামিলের মাথার দামও এক কোটি ডলার ধার্য করা হয়েছিল।
মস্কোর বার্তা
১৯ বছর পর মস্কো কেন শামিল বাসায়েভের মৃত্যু স্মরণ করল? বিশেষত, যখন বিশ্বব্যাপী রাশিয়া এখনো ইউক্রেনে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, তখন এই পোস্টটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এটা কী শুধুমাত্র একটি পুরনো ঘটনার পুনঃপ্রকাশ, নাকি এর পেছনে কোনো বৃহত্তর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের পোস্টের মাধ্যমে মস্কো শামিল বাসায়েভের মতো নেতাদের হত্যার কৌশলকে পুনরায় তুলে ধরতে চাইছে। এটা হতে পারে একটি সতর্কবার্তা, যেখানে ক্রেমলিন এই ইঙ্গিত দিতে চায় যে, তারা কঠোরভাবে যেকোনো ধরনের বিদ্রোহী বা বিরোধী শক্তির মোকাবিলা করবে। এছাড়াও, মস্কো তার রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং গোপনীয়তার দক্ষতা প্রদর্শন করতে চাইছে।
উপসংহার
শামিল বাসায়েভের মৃত্যু শুধু এক ব্যক্তির পতন নয়, একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তা ছিল। মস্কো যখন এই ঘটনার কথা আবার সামনে আনছে, তখন এটি হয়তো সংকেত দিতে চায় যে তার বিরোধী শক্তির প্রতি কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকবে। ভবিষ্যতে যদি এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয় যেখানে বিশ্বব্যাপী কোনো শক্তি রাশিয়ার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, মস্কো তাদের জন্যও প্রস্তুত থাকবে।
সত্যিকারের সাধ্বী নাকি শুধুই লোকদেখানো! নেটপ্রভাবী হর্ষা রিচারিয়া নিয়ে কেন এত বিতর্ক?