বান্ধবীর কাছে ‘হিরো’ হতে গিয়ে ৪,২২৯ যাত্রী নিয়ে প্রমোদতরী ডুবালেন ক্যাপ্টেন!
২০১২ সালের ১৩ জানুয়ারি, শুক্রবার রাত। ভূমধ্যসাগরের বুকে ছুটে চলেছে বিশাল প্রমোদতরী ‘কোস্টা কনকর্ডিয়া’, গন্তব্য ইতালির সাভোনা। প্রায় ১,১৪,৫০০ টন ওজন এবং ২৯০ মিটার দীর্ঘ এই বিলাসবহুল জাহাজে ছিলেন ৩,২০০ জন যাত্রী ও ১,০২৩ জন কর্মী— মোট ৪,২২৯ জন মানুষ। সাত দিনের এই সমুদ্রযাত্রা হওয়ার কথা ছিল আনন্দে ভরা, কিন্তু এক মানুষের একগুঁয়েমি এবং অবহেলার কারণে মুহূর্তে তা পরিণত হয় ভয়াবহ দুর্ঘটনায়।
প্রমোদতরীর ক্যাপ্টেন ছিলেন ফ্রান্সেস্কো শেটিনো। অভিজ্ঞ নাবিক হলেও সেই রাতে তিনি এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেন, যা ইতিহাসে জায়গা করে নেয় এক ভয়াবহ নৌদুর্ঘটনা হিসেবে।
শেটিনোর সঙ্গে সে দিন প্রমোদতরীতে ছিলেন তাঁর বান্ধবী ডমনিকা সেমোর্টান, একজন প্রাক্তন নৃত্যশিল্পী। বান্ধবীর সামনে ‘হিরো’ হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন শেটিনো। এজন্যই হঠাৎ ঠিক করেন, গন্তব্যের নির্ধারিত পথ বদলে জাহাজটি নিয়ে যাবেন গিগলিয়ো দ্বীপের একেবারে কাছাকাছি, যেখানে থাকতেন তাঁর এক প্রাক্তন সহকর্মী মারিয়ো পালোম্বো। যদিও আগেই জানানো হয়েছিল মারিয়ো দ্বীপে নেই, তবু নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরেননি তিনি।
এর উপর আরেকটি বড় ভুল করেন শেটিনো — তিনি চশমা আনতে ভুলে গিয়েছিলেন, ফলে ঠিকভাবে দেখতে পারছিলেন না। অভিজ্ঞতা কম থাকা সহকারীকে দিয়ে পথনির্দেশ করাতে থাকেন। রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে, জাহাজটি দ্বীপের খুব কাছে চলে আসে এবং হঠাৎই পাথরে ধাক্কা খায়। নিচের দিকে প্রায় ৭০ মিটার দীর্ঘ ফাটল ধরে যায়।
প্রথমে শেটিনো যাত্রীদের বোঝান, কিছু হয়নি। এমনকি গিগলিয়ো দ্বীপের উদ্ধার কর্তৃপক্ষের সহায়তাও তিনি অস্বীকার করেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ইঞ্জিন রুমে জল ঢুকতে শুরু করে, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং জাহাজের অর্ধেক ডুবে যেতে থাকে।
অবস্থা ভয়াবহ হলেও জাহাজে কোনও জরুরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল না। যাত্রী ও কর্মীরা আতঙ্কে ছুটোছুটি করতে থাকেন। এক ঘণ্টার মধ্যে জাহাজটি ৩০ ডিগ্রি হেলে পড়ে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় দ্বীপের দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার, কিন্তু তা তখন প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে সাঁতরে দ্বীপে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।
সেই ভয়াবহ রাতে দুইজন ভারতীয় কর্মী — কর্ণনাথ রমেশনা ও রাসেল রেবেলো — প্রাণপণ চেষ্টা করেন যাত্রীদের উদ্ধার করতে। তাঁদের মধ্যে রাসেল নিজের জীবন উৎসর্গ করেন কর্তব্যের পথে।
সবচেয়ে নিন্দনীয় বিষয় ছিল, শেটিনো সবার আগে জাহাজ ছেড়ে পালিয়ে যান। উপকূলরক্ষী বাহিনী তাঁকে ফিরে আসার নির্দেশ দিলেও তিনি তা অমান্য করেন। পরে শেটিনো দাবি করেন, “পা পিছলে গিয়ে” তিনি লাইফবোটে পড়ে গিয়েছিলেন। তিনি এমনকি এক সহকারী নাবিক রবার্টো বোসিয়ো-র উপর দায় চাপানোরও চেষ্টা করেন।
কিন্তু আদালত তাঁর একটিও অজুহাত বিশ্বাস করেনি। এই দুর্ঘটনায় ৩২ জনের মৃত্যু হয় এবং কয়েক শো জন আহত হন। প্রায় ২,০০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয় কোম্পানির। শেষ পর্যন্ত শেটিনোকে দোষী সাব্যস্ত করে জেলে পাঠানো হয়।
এই দুর্ঘটনা প্রমাণ করে দিল, সামান্য অবহেলা ও অহংকার কেমন ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। একটি ভুল সিদ্ধান্ত, একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ এবং একটি মানুষের আত্মম্ভরিতা ৪,২২৯ জনের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছিল। আজও ‘কোস্টা কনকর্ডিয়া’ দুর্ঘটনা সমুদ্রযাত্রার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ট্র্যাজেডি হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।