বাড়িই যখন মাসিক পেনশন!
অবসরের পর অনেকের জীবনটাই বদলে যায়। বেতন বন্ধ হয়, কিন্তু চিকিৎসা, সংসার আর দৈনন্দিন খরচ থেমে থাকে না। বিশেষ করে যাঁরা বেসরকারি চাকরি করতেন বা পর্যাপ্ত পেনশন নেই, তাঁদের কাছে এই সময়টা বেশ চাপের। কিন্তু যদি নিজের নামে একটি বাড়ি থাকে, তা হলে সেই বাড়িই হয়ে উঠতে পারে নিয়মিত আয়ের ভরসা।
প্রবীণ নাগরিকদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি ব্যাঙ্কে রয়েছে একটি বিশেষ প্রকল্প—রিভার্স মর্টগেজ বা বিপরীত বন্ধকি। এই প্রকল্পে বাড়ি বন্ধক রেখে প্রতি মাসে নিয়মিত টাকা পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে সেই অঙ্ক পৌঁছতে পারে মাসে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত।
কী এই রিভার্স মর্টগেজ?
সহজ ভাবে বললে, এটি বাড়ির বিপরীতে নেওয়া এমন এক ঋণ, যেখানে আপনাকে কিস্তি দিতে হয় না। বরং ব্যাঙ্কই আপনাকে মাসে মাসে টাকা দেয়। বাড়ির বাজারমূল্যের উপর নির্ভর করে এই মাসিক অঙ্ক নির্ধারিত হয়।
এই প্রকল্প চালু আছে State Bank of India, Punjab National Bank, HDFC Bank-সহ প্রায় সব সরকারি ও বেসরকারি ব্যাঙ্কে।
সাধারণত ব্যাঙ্কের সঙ্গে ২০ বছরের একটি চুক্তি হয়। এই সময়ের মধ্যে বাড়ির মালিকানা আপনার কাছেই থাকে, শুধু বাড়ির একটি অংশ (প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত) ব্যাঙ্কের জামানত হিসেবে ধরা হয়।
সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলি কী?
- নিজের বাড়িতেই থাকা যাবে: রিভার্স মর্টগেজ নিলে কাউকে বাড়ি ছাড়তে হয় না। আজীবন সেই বাড়িতেই থাকার অধিকার থাকে।
- মাসিক টাকা পুরোপুরি করমুক্ত: ব্যাঙ্ক থেকে যে টাকা পাওয়া যায়, তার উপর কোনও আয়কর দিতে হয় না।
- পেনশনের বিকল্প আয়: যাঁদের পেনশন নেই বা কম, তাঁদের জন্য এটি হতে পারে নির্ভরযোগ্য মাসিক আয়ের উৎস।
- উত্তরাধিকারীদের অধিকার বজায় থাকে: বাড়ির মালিক ও তাঁর সঙ্গীর মৃত্যুর পরে উত্তরাধিকারীরা চাইলে ব্যাঙ্কের পাওনা মিটিয়ে পুরো বাড়ির মালিকানা ফিরে পেতে পারেন। না চাইলে বাড়ি বিক্রিও করতে পারেন।
একটি উদাহরণে বুঝে নেওয়া যাক
ধরা যাক, কোনও দম্পতির নিজের বাড়ির বর্তমান বাজারমূল্য চার কোটি টাকা। তাঁদের সন্তানরা অন্য শহরে থাকেন। এই অবস্থায় তাঁরা রিভার্স মর্টগেজ নিলে ব্যাঙ্ক বাড়ির প্রায় ৪০ শতাংশ মূল্য ধরে মাসে সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে পারে। এই টাকা তাঁরা আমৃত্যু পেতে পারেন, কোনও কিস্তি বা শোধের ঝামেলা ছাড়াই।
কারা আবেদন করতে পারবেন?
- একক আবেদনকারীর বয়স ৬০ বছর বা তার বেশি হতে হবে।
- স্বামী-স্ত্রী যৌথ ভাবে আবেদন করলে ন্যূনতম বয়স সাধারণত ৫৮ বছর।
- বাড়িটি আবেদনকারীর নিজের নামে হতে হবে এবং আইনি জটিলতা মুক্ত হওয়া জরুরি।
কিছু বাস্তব দিক মাথায় রাখবেন
ব্যাঙ্ক ঋণ মঞ্জুর করার আগে বাড়ির বাজারদর, অবস্থান, বয়স এবং এলাকায় চাহিদা—সব কিছু খতিয়ে দেখে। বড় শহর বা চাহিদাপূর্ণ এলাকায় থাকলে ঋণের অঙ্ক বেশি হয়। সাধারণত এই ঋণের ঊর্ধ্বসীমা এক থেকে দুই কোটি টাকার মধ্যে থাকে।
শেষ কথা
রিভার্স মর্টগেজ কোনও দান নয়, আবার বাড়ি হাতছাড়া করার ফাঁদও নয়। সঠিক ভাবে বুঝে, শর্ত খুঁটিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত নিলে অবসরজীবনে এটি হতে পারে আর্থিক নিরাপত্তার বড় ভরসা। নিজের বাড়ি থাকলে, সেটাই হয়ে উঠতে পারে মাসিক নিশ্চিন্ত আয়ের চাবিকাঠি।