বাঁহাতি স্পিনে সমস্যায় ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা
ভারতীয় ক্রিকেটে একটি সময় স্পিন খেলা ছিল ব্যাটসম্যানদের অন্যতম দক্ষতা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। বিগত চার বছরে বাঁহাতি স্পিনারদের বিরুদ্ধে অসহায় হয়ে পড়েছেন ভারতের শীর্ষস্থানীয় ব্যাটসম্যানরা। বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা, শুভমন গিলসহ একাধিক ব্যাটসম্যান বারবার বাঁহাতি স্পিনে আউট হচ্ছেন, যা বিশেষজ্ঞদের মনে প্রশ্ন তুলেছে—কোথায় তাদের দুর্বলতা?
কেন এতটা অসুবিধায় পড়ছেন ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা?
গত চার বছরে দেখা গেছে, বিরাট ১১ বার, রোহিত ১৩ বার এবং গিল ১১ বার বাঁহাতি স্পিনারদের বলে আউট হয়েছেন। অথচ এর আগে ইংল্যান্ডের মন্টি পানেসর বা শ্রীলঙ্কার রঙ্গনা হেরাথের বলেও ভারতের ব্যাটিং এইভাবে ভেঙে পড়ত না। সাম্প্রতিক কালে নিউজিল্যান্ডের মিচেল স্যান্টনার মাত্র একটি ম্যাচেই ১৩টি উইকেট নিয়ে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের যথেষ্ট সমস্যায় ফেলেন। বিশেষ করে স্যান্টনারের বল সোজা লাইনে পড়ে এবং সামান্য ঘোরে, তাতেই ভারতীয়রা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। পুণের মাঠে স্যান্টনারের বল থেকে যেমন ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা একাধিক বার ভুল লাইনে খেলেছেন, তেমনই একই ছবি দেখা গেছে অন্যান্য ম্যাচেও।
টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের চাপ ও আক্রমণাত্মক খেলার প্রভাব
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ শুরুর পর থেকেই টেস্টে আক্রমণাত্মক খেলার প্রতি বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ফাইনালে উঠতে গেলে জয় নিশ্চিত করতে হবে, এবং সে কারণে ব্যাটসম্যানদের আরো ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। রোহিত নিজেই একবার বলেছিলেন যে তারা সব ম্যাচ জিততে চান, যা আক্রমণাত্মক খেলার প্রবণতাকে বাড়িয়ে তুলেছে। কিন্তু এই আক্রমণাত্মক খেলার ধরনেই টেকনিকের অভাব প্রকট হয়ে উঠছে। আর তাতে স্পিনারের বল ছাড়ার বা ধৈর্য ধরে খেলার ব্যাপারে মনোযোগ কমে যাচ্ছে।
টেকনিক্যাল সমস্যা: সঠিক লাইন বুঝতে না পারা
ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের টেকনিকেও বেশকিছু ফাঁকফোকর ধরা পড়েছে। টেস্টে স্পিন বলের লাইনে খেলতে না পারায় তাদের আউটের প্রবণতা বেড়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, কোহলিকে স্যান্টনারের বল ফুল লেংথে পড়ে সোজা চলে যাওয়ায় তিনি বোল্ড হয়েছেন। এ প্রসঙ্গে বাংলার রঞ্জিজয়ী অধিনায়ক সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, স্পিনের বিরুদ্ধে খেলার জন্য কিছু বিশেষ টেকনিক রপ্ত করা প্রয়োজন। যেখানে ব্যাট-প্যাডের মধ্যে দূরত্ব বজায় রাখা আবশ্যক। কিন্তু বর্তমান ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা সেই টেকনিক প্রয়োগে ত্রুটি করছেন।
সাদা বলের ক্রিকেটের প্রভাব
টি-টোয়েন্টির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা ও সাদা বলের খেলার প্রভাবে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের ধৈর্যের অভাব তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বেশিরভাগ খেলায় দ্রুত শট খেলে আক্রমণাত্মক মানসিকতা বজায় রাখা হয়। এতে বল ছাড়ার অভ্যাসও অনেক কমে গেছে। সাদা বলের ক্রিকেটে যেখানে আক্রমণাত্মক শট খেলা হয়, টেস্টে তেমনভাবে খেললে ব্যাটসম্যানরা সহজেই আউট হতে পারেন। সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “স্পিনের বিরুদ্ধে বল ছাড়াও এক ধরণের শিল্প, যা ব্যাটসম্যানদের বোঝা উচিত।”
মানসিকতায় সমস্যার ছাপ
শুধু টেকনিক নয়, ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের মানসিকতাও স্পিন খেলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিরাট কোহলির ক্ষেত্রেই ধরা যাক। গত আইপিএলে ভালো ফর্মে থাকা কোহলি এখন মানসিকভাবে চাপে আছেন বলে বোঝা যাচ্ছে। চাপের কারণেই হয়তো তিনি আগের মতো আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারছেন না। এ পরিস্থিতিতে বারবার একই ভুল করতে গিয়ে তার মানসিকতাও ভেঙে পড়ছে।
বাইরের ব্যস্ততা ও খেলার মনোযোগ
ভারতের ব্যাটসম্যানরা সবাই তারকা এবং বিভিন্ন বিজ্ঞাপন, অনুষ্ঠানে ব্যস্ত থাকেন। এমনকি অনেকের কাছে বড় সংস্থার দূতও তাঁরা। এর ফলে কি তাদের মনোযোগ ক্রিকেট থেকে সরে যাচ্ছে? বাংলার প্রাক্তন অধিনায়ক লক্ষ্মীরতন শুক্লার মতে, ভারতের দলের মানসিকতা এখন অনেকটা বিজ্ঞাপন এবং ব্যক্তিগত বিষয়ে মগ্ন হয়ে উঠেছে। নিউ জ়িল্যান্ডকে হালকাভাবে নেওয়া হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। শুক্লা বলেন, “আমাদের ক্রিকেটাররা ক্রিকেট থেকে মন সরে গিয়ে বিজ্ঞাপন এবং অনুষ্ঠানে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। সেই কারণেই এই ফল।”
সমাধানের পথে যাওয়া জরুরি
বাঁহাতি স্পিনের বিরুদ্ধে ভারতের এই দুর্বলতা দূর করতে হলে প্রয়োজন টেকনিক এবং মানসিকতার উন্নতি। প্রয়োজনে দেশের অভিজ্ঞ স্পিন কোচদের সাহায্যে অনুশীলনের সময় বাড়াতে হবে এবং ফোকাস রাখতে হবে খেলার প্রতি। ভারতীয় ক্রিকেটের ঐতিহ্য স্পিনকে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে গ্রহণ করার মধ্যে নিহিত।