বড়বাজারে হোটেল যেন মৃত্যুকূপ!
একটি হোটেল, যেখানে মানুষ এসেছিলেন আশ্রয় নিতে, রাত্রিবাসে স্বস্তি খুঁজতে। কিন্তু সেই হোটেলই একরাতে পরিণত হল মৃত্যুকূপে। কলকাতার বড়বাজারে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারালেন অন্তত ১৪ জন। কেউ দমবন্ধ হয়ে, কেউ আগুনে পুড়ে, কেউ আবার আতঙ্কে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে।
কী বলছে ময়নাতদন্ত?
আরজি কর, এনআরএস ও মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মিলিয়ে ১৪ জন মৃতের ময়নাতদন্তে জানা গেছে—প্রায় সকলেই মারা গেছেন বিষাক্ত ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে। এক ব্যক্তির দেহে রয়েছে আগুনে পুড়ে যাওয়ার চিহ্ন। আরও এক জন ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে মারা গেছেন, তার শরীরে পড়ে যাওয়ার চিহ্ন স্পষ্ট।
হোটেলের গাফিলতিতে চোখ কপালে
এই মর্মান্তিক মৃত্যুর পিছনে রয়েছে একের পর এক গাফিলতির পাহাড়। হোটেলের ফায়ার লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছিল তিন বছর আগে, তা আর নবীকরণই করা হয়নি। অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ছিল বটে, কিন্তু কার্যকর ছিল না। এমনকি আগুন লাগার সময় বাজেনি কোনও ফায়ার অ্যালার্মও!
জানা গেছে, হোটেলে চলছিল প্লাইউডের কাজ। সেখান থেকেই আগুনের সূত্রপাত, ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে হোটেলের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। ভেন্টিলেশন না থাকায় ধোঁয়া বেরোতে পারেনি। অধিকাংশ জানলাও ছিল বন্ধ, কিছু জানলা তো ইট-সিমেন্ট দিয়ে বুজিয়েই দেওয়া ছিল!
মৃত্যুর পথ যেন বন্ধ সিঁড়ি
হোটেলের একাধিক তলায় ধোঁয়া জমে গিয়েছিল। একজনের দেহ পাওয়া গেছে সিঁড়িতে, মনে করা হচ্ছে পালাতে গিয়ে আগুনে পুড়ে মারা গেছেন তিনি। ছাদে পাওয়া গেছে আরও দুটি দেহ। হোটেলের অন্য প্রান্তে আর একটি সিঁড়ি ছিল, কিন্তু তাতে শাটার লাগানো ছিল—অগ্নিকাণ্ডের সময় তা বন্ধই ছিল!
তদন্ত শুরু, মালিক পলাতক
কলকাতা পুলিশের কমিশনার জানিয়েছেন, তদন্তে একাধিক আধিকারিকের একটি দল গঠন করা হয়েছে। হোটেলের ম্যানেজারকে জেরা করা হচ্ছে। মালিকদের বিরুদ্ধে দমকল আইনের ধারায় মামলা হয়েছে, তবে দু’জন মালিকই পলাতক।
মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষোভ ও সহানুভূতি
দিঘা থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, হোটেলে দাহ্য পদার্থ মজুত ছিল বলেই মৃত্যু হয়েছে এতজনের। মৃতদের পরিবারকে দেওয়া হবে দু’লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ, আহতদের পঞ্চাশ হাজার টাকা। ৯৯ জনকে দমকল ও পুলিশের সহায়তায় উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
বিরোধীর তির
এই ঘটনায় সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি, “যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকাতেই এই মর্মান্তিক ঘটনা। প্রশাসনও যথাযথভাবে তৎপর ছিল না।”
আতঙ্কের রাত, জীবনযুদ্ধে জয়
ঘটনার রাতে ওড়িশার নেহা আগরওয়াল তাঁর স্বামী ও ভাইপোকে নিয়ে পাঁচ তলার কার্নিসে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রায় দু’ঘণ্টা। জানালার কাচ ভেঙে কোনোরকমে কার্নিসে এসে দাঁড়ান। শেষমেশ দমকল এসে তাঁদের উদ্ধার করে।
এই অগ্নিকাণ্ড শুধুই মৃত্যু আর আতঙ্ক নয়, এটি কলকাতার নাগরিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতার নির্মম দলিলও বটে। এই ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না হয়—এটাই এখন বড় প্রার্থনা।