হরিদ্বারে চায়ের দোকানে মৃত সুরেন্দ্র কোলি!
নিঠারি-কাণ্ডে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর সব মামলায় বেকসুর খালাস পেয়েছিলেন সুরেন্দ্র কোলি। প্রায় দুই দশক কারাগারে কাটানোর পর ২০২৫ সালের নভেম্বরে মুক্তি পান তিনি। কিন্তু জেল থেকে বেরিয়ে নতুন জীবন শুরু করাও তাঁর কাছে সহজ হয়নি। কাজ এবং মাথা গোঁজার জায়গার খোঁজে এক শহর থেকে অন্য শহরে ঘুরেছেন। শেষ পর্যন্ত হরিদ্বারে একটি চায়ের দোকান ভাড়া নিয়ে সেখানেই থাকতে শুরু করেছিলেন। ১৮ সেপ্টেম্বর সকালে সেই দোকান থেকেই তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। পুলিশ প্রাথমিক ভাবে আত্মহত্যার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে। তবে মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনও তদন্তাধীন।
সুরেন্দ্রের দাদা চন্দন কোলির বক্তব্য, জেল থেকে বেরোনোর পর চেন্নাই এবং বেঙ্গালুরুতে গিয়েছিলেন তাঁর ভাই। কিন্তু সেখানে তাঁর পরিচয় জানাজানি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। চন্দনের দাবি, কয়েক জন সুরেন্দ্রের জীবনের উপর তথ্যচিত্র তৈরির কথা বলে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন। সেই পরিস্থিতি থেকে দূরে থাকতেই তিনি বার বার জায়গা বদল করছিলেন।
চলতি বছরের জুনে দিল্লিতে দাদার কাছে কিছু দিন ছিলেন সুরেন্দ্র। সেখানেও চাকরির চেষ্টা করেন। কিন্তু কাজ না পেয়ে পরে হরিদ্বারে চলে যান। রোশনাবাদ এলাকায় থাকার জায়গা এবং কাজের সন্ধান করতে গিয়ে আধার বা পরিচয়পত্র দেখানোর প্রয়োজন পড়ত। পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তিনি নিজের নথি দেখাতে চাইতেন না।
হরিদ্বারে প্রথমে নিরাপত্তারক্ষীর কাজ নেন সুরেন্দ্র। একটি কারখানায় কাজ করার পর অন্য একটি আবাসনেও নিরাপত্তারক্ষীর দায়িত্ব পান। কিন্তু কোনও কাজেই বেশিদিন স্থায়ী হননি। পরে স্থানীয় পরিচিত জয় কাশ্যপ তাঁকে থাকার জায়গা এবং কাজ খুঁজতে সাহায্য করেন। তবে জয়কে নিজের আসল পরিচয় জানাননি সুরেন্দ্র। তাঁর কাছে নিজের নাম ‘সদারাম’ এবং বাড়ি আলমোড়ায় বলে পরিচয় দিয়েছিলেন বলে দাবি জয়ের।
মৃত্যুর কয়েক দিন আগে পরিচিত ধর্মেন্দ্র কৌশিকের পরিচয়পত্র ব্যবহার করে একটি চায়ের দোকান ভাড়া নেন সুরেন্দ্র। নিজের জিনিসপত্র নিয়ে সেখানেই থাকতে শুরু করেন। পরিচিতদের দাবি, জেলমুক্তির পর আর্থিক সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। আলমোড়ার এক পরিচিত নারায়ণ সিংহ রাওয়াত জানিয়েছেন, সুরেন্দ্র তাঁর কাছে ১৫ হাজার টাকা চেয়েছিলেন চায়ের দোকান শুরু করার জন্য। মৃত্যুর আগের রাতেও টাকার অভাব নিয়ে তাঁর মানসিক চাপের কথা ধর্মেন্দ্র জানিয়েছিলেন বলে দাবি নারায়ণের।
১৮ সেপ্টেম্বর সকালে হরিদ্বারের সপত সরোবর রোডের কাছে ওই চায়ের দোকান থেকে সুরেন্দ্রের দেহ উদ্ধার হয়। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে কোনও সুইসাইড নোট পাওয়া যায়নি। ফরেন্সিক পরীক্ষা এবং ময়নাতদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সুরেন্দ্রের জীবনের শেষ অধ্যায়টি জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের সঙ্গে। ২০০৬ সালে উত্তরপ্রদেশের নিঠারিতে একাধিক শিশু ও তরুণী নিখোঁজ হওয়ার পর একটি বাড়ির পিছনে নালা ও এলাকায় মানবদেহের দেহাবশেষ উদ্ধার হয়। সুরেন্দ্র কোলি ও ব্যবসায়ী মণীন্দ্র সিংহ পান্ধেরকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে একাধিক মামলায় কোলির সাজা হয়, এমনকি মৃত্যুদণ্ডও দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু পরবর্তী বিচারপর্বে তদন্ত ও প্রমাণ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। ২০২৩ সালে এলাহাবাদ হাই কোর্ট একাধিক মামলায় কোলি ও পান্ধেরকে খালাস দেয়। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সুপ্রিম কোর্ট সেই খালাস বহাল রাখে। কোলির বিরুদ্ধে থাকা শেষ মামলাতেও নভেম্বর ২০২৫-এ শীর্ষ আদালত তাঁকে খালাস করে। ফলে নিঠারি-কাণ্ডের সব মামলাতেই তাঁর বিরুদ্ধে আর কোনও দণ্ড বহাল থাকেনি।
প্রায় দুই দশকের কারাবাসের পর মুক্ত জীবনে ফিরে সুরেন্দ্র যে নতুন করে নিজের পরিচয় আড়াল করে বাঁচার চেষ্টা করছিলেন, তাঁর মৃত্যু সেই জীবনের এক অমীমাংসিত অধ্যায়ই রেখে গেল। তাঁর মৃত্যুর নেপথ্যে ঠিক কী ছিল, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত ভাবে বলা সম্ভব নয়।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?।