পথ দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেতে সারমেয়দের গলায় রেডিয়াম বেল্ট
“জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ইশ্বর”— স্বামী বিবেকানন্দের এই আদর্শকে বাস্তব রূপ দিলেন পূর্ব বর্ধমানের এক যুবক। পথ দুর্ঘটনার হাত থেকে নিরীহ পথ সারমেয়দের বাঁচাতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন নিরঞ্জন মালিক নামে এক যুবক। তাঁর প্রচেষ্টায় জাতীয় সড়ক ও ব্যস্ত রাস্তাগুলিতে কুকুরদের গলায় পরানো হচ্ছে রেডিয়াম বেল্ট। এই উদ্যোগের মাধ্যমে অন্ধকারে দূর থেকেই তাদের অবস্থান বুঝতে পারবে চালকেরা, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উদ্যোগের সূচনা এবং প্রয়োজনীয়তা
রাতের অন্ধকারে অনেক সময়ই হঠাৎ করে পথের মাঝে চলে আসে সারমেয়রা। চালকেরা তাদের উপস্থিতি বুঝতে না পেরে দুর্ঘটনার শিকার হন। এমনকি, সারমেয়দের বাঁচানোর চেষ্টায় চালকদের নিজস্ব প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। জাতীয় সড়ক ও রাজ্য সড়কের পাশে প্রায়ই দেখা যায় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে থাকা সারমেয়দের ছিন্ন-ভিন্ন দেহ। এমনই এক পরিস্থিতিতে এগিয়ে আসেন নিরঞ্জন মালিক।
পেশায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী নিরঞ্জন নিজের উদ্যোগে এই প্রকল্প চালু করেন। সোমবার ১৯ নম্বর জাতীয় সড়ক এবং বর্ধমান-আরামবাগ রোডের আশেপাশে প্রায় ৫০টি সারমেয়কে রেডিয়াম বেল্ট পরানো হয়েছে। নিরঞ্জনের বক্তব্য, “রেডিয়াম বেল্টের কারণে রাতের অন্ধকারে দূর থেকেই সারমেয়দের উপস্থিতি টের পাবেন চালকেরা। এতে কুকুরদের পাশাপাশি চালকদেরও দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।”
মানবিকতার নজির
এই উদ্যোগ অবশ্যই পশুপ্রেমীদের মধ্যে আশার আলো দেখাচ্ছে। এর আগে একই রকম উদ্যোগ নিয়ে দেশের মানুষকে চমকে দিয়েছিলেন শান্তনু নাইডু। তাঁর তৈরি রেডিয়াম কলার পথ কুকুরদের রক্ষা করতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল এবং সেই কাজ রতন টাটার নজর কাড়ে। বাংলার মাটিতে নিরঞ্জনের এই প্রচেষ্টা যেন শান্তনুর সেই মানবিক উদ্যোগেরই প্রতিফলন।
প্রতিক্রিয়া ও সমাজের ভূমিকা
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, পথ কুকুরদের দুর্ঘটনায় মৃত্যু এক গভীর সমস্যা। তাদের জীবনও আমাদের সমাজেরই একটি অংশ। এই উদ্যোগের ফলে প্রাণহানি কমবে এবং সামগ্রিকভাবে একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি হবে। অনেকেই নিরঞ্জনের প্রশংসা করে বলেন, “এটা সত্যিই প্রশংসনীয় কাজ। ছোট উদ্যোগের মাধ্যমে এতগুলো প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে, এটা ভাবতেই ভালো লাগে।”
পশ্চিম বর্ধমানের বিপরীত চিত্র
যেখানে পূর্ব বর্ধমানে মানবিক উদ্যোগের নজির তৈরি হচ্ছে, সেখানে পশ্চিম বর্ধমানে ঘটেছে এক ভয়াবহ ঘটনা। কিছুদিন আগেই শীতের রাতে পথ সারমেয় শাবকদের পুড়িয়ে মারার অভিযোগে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছিল দুর্গাপুরের তিলক রোড এলাকায়। পাঁচটি সারমেয় শাবককে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করা হয়। স্থানীয়দের তৎপরতায় উদ্ধার করা গেলেও, একটি শাবকের মৃত্যু হয়। ঘটনাটি নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দেয় এবং পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।
এক আশার আলো
অন্যদিকে, নিরঞ্জনের উদ্যোগ যেন সমাজে আশার আলো জ্বালাচ্ছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে পথ সারমেয়দের জীবন বাঁচানোর পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে। রেডিয়াম বেল্টের মতো ছোট একটি সরঞ্জাম প্রাণহানি ঠেকাতে যে কতটা কার্যকর হতে পারে, তা এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রমাণিত হচ্ছে।
উপসংহার
একদিকে মানবিকতার জয়, অন্যদিকে সমাজের পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা— দুই বিপরীত চিত্রের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছে আমাদের সমাজ। তবে নিরঞ্জন মালিকের এই উদ্যোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটু সদিচ্ছা আর মানবিকতা থাকলে প্রাণীজগৎকে রক্ষা করা সম্ভব। তাঁর এই উদ্যোগ শুধু সারমেয়দেরই নয়, পথচারী এবং চালকদেরও নিরাপত্তা দেবে। সমাজের আরও মানুষ যদি এই কাজে এগিয়ে আসেন, তাহলে পথ দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।
সত্যিই, “জীবে প্রেম” যেন এই পৃথিবীকে আরও সুন্দর করে তোলে।