নিট-এনটিএ বিতর্কের আড়ালে আরও বড় প্রশ্ন!
নিটে প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষা পরিচালনায় অনিয়ম কিংবা ইউজিসি-নেট বাতিল—একটার পর একটা ঘটনায় জাতীয় স্তরের পরীক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কাঠগড়ায় স্বাভাবিক ভাবেই আসছে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ। কিন্তু সমস্যা কি শুধুই একটি পরীক্ষার আয়োজক সংস্থার? শিক্ষাবিদদের একাংশের মতে, এর পিছনে আরও বড় একটি প্রবণতা কাজ করছে—শিক্ষাব্যবস্থায় ক্রমবর্ধমান অতিকেন্দ্রিকতা।
নিট, কুয়েট, ইউজিসি-নেটের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার দায়িত্ব এনটিএ-র হাতে। ফলে একটি পরীক্ষায় সমস্যা তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে দেশের বিস্তীর্ণ অংশের ছাত্রছাত্রীর উপর। সম্প্রতি ইউজিসি-নেটের কয়েকটি বিষয়ের পরীক্ষা বাতিল করে ফের পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তও সেই প্রশ্নকে আরও সামনে এনেছে। সরকারি ভাবে প্রশ্নপত্রের ত্রুটি এবং পুরনো প্রশ্ন পুনর্ব্যবহারের কথা বলা হলেও পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে পড়ুয়া ও শিক্ষামহলে সংশয় রয়েছে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পার্থপ্রতিম রায়ের মতে, ব্যবস্থার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণের ফলে কোনও একটি জায়গায় সমস্যা হলেই তার অভিঘাত পড়ে গোটা দেশের উপর। প্রাক্তন উপাচার্য ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী শিবাজীপ্রতিম বসুও প্রশ্ন তুলেছেন, যখন দেশের বিভিন্ন রাজ্যের স্কুলের পাঠ্যক্রম, ভাষা এবং মূল্যায়ন পদ্ধতিতে এত বৈচিত্র রয়েছে, তখন উচ্চশিক্ষায় একটি অভিন্ন কেন্দ্রীয় পরীক্ষাই কতটা যথাযথ হতে পারে।
এই বিতর্কের শিকড় অবশ্য আরও পুরনো। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় শিক্ষা মূলত রাজ্যগুলির নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৯৭৬ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে শিক্ষা যৌথ তালিকায় আসে। তার পর বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্রীয় ভূমিকা বেড়েছে। গত এক দশকে জাতীয় স্তরের প্রবেশিকা পরীক্ষা এবং একাধিক অভিন্ন কাঠামোর মাধ্যমে সেই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
নিট চালুর আগে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ডাক্তারিতে ভর্তির জন্য নিজস্ব পরীক্ষা বা পদ্ধতি ছিল। কোথাও রাজ্য জয়েন্ট এন্ট্রান্স, কোথাও আবার উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফলও বিবেচনায় আসত। নিটের পক্ষে যুক্তি ছিল, একটি অভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে সারা দেশের পড়ুয়াদের জন্য একই সুযোগ তৈরি করা যাবে। কিন্তু এর ফলে কোচিং-নির্ভরতা বাড়ছে এবং গ্রামীণ বা রাজ্য বোর্ডের পড়ুয়ারা সমস্যায় পড়ছেন—এমন অভিযোগও বহু বার সামনে এসেছে।
একই প্রবণতা এখন উচ্চশিক্ষার অন্যান্য ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে। কুয়েটের মাধ্যমে দেশের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া কেন্দ্রীয় মেধাক্রমের উপর নির্ভরশীল হয়েছে। অথচ জেএনইউ, প্রেসিডেন্সি বা যাদবপুরের মতো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব শিক্ষাগত ঐতিহ্য ও প্রয়োজন রয়েছে। অনেক শিক্ষাবিদের মতে, একই ধরনের প্রশ্নপত্র দিয়ে সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী বাছাই করলে সেই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব শিক্ষাগত লক্ষ্য ও বৈশিষ্ট্য যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।
শুধু পরীক্ষা নয়, উচ্চশিক্ষার প্রশাসন ও গবেষণাতেও কেন্দ্রীকরণের প্রশ্ন উঠছে। ‘ওয়ান নেশন, ওয়ান সাবস্ক্রিপশন’-এর মতো উদ্যোগে কেন্দ্র অনুমোদিত গবেষণা-জার্নালের উপর নির্ভরতা বাড়লে ছোট কিন্তু বিশেষায়িত প্রকাশনার গুরুত্ব কমতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। আবার বিশ্ববিদ্যালয়গুলির নিয়ন্ত্রক কাঠামোকে আরও একীভূত করার প্রস্তাব নিয়েও শিক্ষামহলে বিতর্ক রয়েছে।
এর পাশাপাশি রয়েছে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর শূন্যপদ। সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে প্রায় ১৮,৯৫১টি শিক্ষক পদের মধ্যে ৪,৮৮৯টি খালি ছিল। রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতেও বহু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। অথচ নিজস্ব প্রবেশিকা বা পৃথক ভর্তি ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক ও প্রশাসনিক পরিকাঠামো প্রয়োজন।
সমস্যার আর একটি দিক কোচিং-নির্ভরতা। কেন্দ্রীয় পরীক্ষার নম্বরই যখন ভর্তির প্রধান দরজা হয়ে ওঠে, তখন অনেক পড়ুয়ার কাছে স্কুলের পাঠ্যক্রমের বদলে পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রস্তুতিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শিক্ষাবিদদের একাংশের প্রস্তাব, প্রবেশিকা পরীক্ষার পাশাপাশি স্কুলের ফলাফল, লিখিত উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা, যুক্তিবোধ এবং অন্যান্য শিক্ষাগত সূচকও বিবেচনায় আনা যেতে পারে।
চিনের গাওখাও বা আমেরিকা-ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি ব্যবস্থার উদাহরণ টেনে কেউ কেউ বলছেন, কেন্দ্রীয় সমন্বয় থাকলেও সব ক্ষেত্রে একটিমাত্র অভিন্ন পরীক্ষার উপর নির্ভর করতেই হবে এমন নয়। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও প্রতিষ্ঠানের সামাজিক এবং শিক্ষাগত বাস্তবতা আলাদা। তাই একই কাঠামো সবার জন্য কার্যকর হবে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
অবশেষে বিতর্কটি শুধু এনটিএ-র দক্ষতা বা পরীক্ষার নিরাপত্তায় আটকে থাকছে না। প্রশ্ন উঠছে—দেশের মতো শিক্ষাব্যবস্থাকেও কি একই ছাঁচে আনা সম্ভব? উৎকর্ষের জন্য দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব সংস্কৃতি তৈরি করা বিশ্ববিদ্যালয়গুলির স্বায়ত্তশাসন, আঞ্চলিক শিক্ষাব্যবস্থার বৈচিত্র এবং ছাত্রছাত্রীদের সামাজিক বাস্তবতা—এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য কী ভাবে রাখা হবে, সেটিই সম্ভবত আগামী দিনের বড় প্রশ্ন।
কেন্দ্রীয় পরীক্ষা ব্যবস্থায় ত্রুটি কমানো জরুরি। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকাঠামো শক্তিশালী করা, শিক্ষক-শূন্যপদ পূরণ এবং প্রতিষ্ঠানগুলির প্রয়োজন অনুযায়ী ভর্তি প্রক্রিয়া নির্ধারণের সুযোগ রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক তাই ‘এক দেশ, এক পরীক্ষা’র প্রশ্নের চেয়েও অনেক বড়।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?।