রিমঝিম সিংহ
গত আগস্টের ১৪ তারিখে কলকাতার স্বাধীনতা দিবসে শুরু হওয়া ‘মেয়েরা রাত দখল করো’ আন্দোলন সাম্প্রতিক সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক আন্দোলন। এই আন্দোলনের আহ্বায়ক, রিমঝিম সিংহ, যিনি প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রাক্তনী, তাত্ক্ষণিকভাবে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন। কিন্তু দুই মাস পর, আজ আমরা প্রশ্ন করতে বাধ্য হচ্ছি—রিমঝিম কোথায়? এবং সেই স্বতঃস্ফূর্ত নাগরিক সমাজের সদস্যরা কোথায় গেলেন?
আমরা জানি, অনেক নাগরিক, যারা আগে কখনও কোনো মিছিলে হাঁটেননি বা স্লোগান তোলেননি, হঠাৎ করেই একত্রিত হয়েছেন এবং আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। এই পরিবর্তন আসলে একটি বৃহত্তর সামাজিক অসন্তোষের প্রতিফলন। রিমঝিম বলেন, “আমি এখন সংগঠন গুছোচ্ছি।” তিনি জানালেন, এটি একটি দালান গুছানোর মতো কাজ, যাতে ছোটোখাটো নয় বরং একটি বৃহৎ এবং সংগঠিত আন্দোলন তৈরি করা যায়।
১৪ অগস্টের আন্দোলনের পর থেকে বিভিন্ন নামে একাধিক কর্মসূচি শুরু হয়েছে। ‘রাত দখল অধিকার দখল’, ‘পথের দাবি’, এবং ‘তিলোত্তমার পাশে ময়দান’ ইত্যাদি। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, কেন এই কর্মসূচিগুলি আগের মতো জনসমর্থন পাচ্ছে না? বিশেষ করে ৪ সেপ্টেম্বরের রাত দখল আন্দোলন, যা আগের মতো প্রভাব ফেলতে পারেনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে আন্দোলনটি কলকাতার কেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনের প্রভাবে।

মৌসুমি অস্থিরতা এবং প্রতিবাদের জায়গা হিসেবে ধর্মতলায় ১৫ অক্টোবরের ‘দ্রোহের কার্নিভাল’-এ নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল। অনেকেই বলছেন, এটি একটি সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তির উপস্থিতির প্রতিফলন। তবে উর্বা চৌধুরী, আন্দোলনের একজন সংগঠক, মনে করেন যে আন্দোলন স্তিমিত হচ্ছে বলে তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। তিনি বলেন, “মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত যোগদান গুরুত্বপূর্ণ, তবে আমাদের কর্মসূচির ধরন ও সমন্বয়ের প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি।”
রিমঝিমের মতে, আন্দোলনের ‘হুজুগ’ তৈরি হয়েছিল তবে তা স্থায়ী হয়নি। তিনি জানান, “প্রথমে অনেক মানুষ বেরিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু এক মাস পরে দেখা যায়, আন্দোলনের সংখ্যা কমে গেছে।” তাই তারা এখন একটি সুসংগঠিত রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এটি কি আন্দোলনের একটি প্রত্যাবর্তন হতে পারে?
আরজি কর আন্দোলনের পর থেকে শান্তিপূর্ণ গণক্ষোভের যে দৃশ্যপট তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবে সমাজের একাংশের ক্ষোভের প্রতিফলন। রিমঝিম মনে করেন, তারা চান নাগরিক আন্দোলন স্বাধীনভাবে চলুক, যাতে সংসদীয় রাজনীতির ছোঁয়া না লাগে। তার ভাষায়, “অনেক সময় রাজনৈতিক দলগুলি আন্দোলনকে দখল করার চেষ্টা করে।” তাই, তারা নতুন করে দাবিগুলি সুসংহত করতে চান, যাতে আন্দোলন কলকাতা থেকে জেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এই আন্দোলনে নারীদের অগ্রণী ভূমিকা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। মহিলা চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনার পর, নারীরা গণ আন্দোলনে আরো বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। রিমঝিমের মতে, এই আন্দোলনগুলি সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য একটি নতুন ভিত্তি তৈরি করছে।
রাত দখল আন্দোলনের নারী সংগঠকেরা, যেমন মুনমুন এবং প্রিয়স্মিতা, চান যে, এই আন্দোলন আরো তৃণমূল স্তরে পৌঁছাক। তারা ছোট ছোট ‘রাতের মিটিং’ শুরু করেছেন, যেখানে নারীরা নিজেদের সমস্যা খুলে বলবেন এবং একে অপরকে বুঝতে পারবেন। তাদের আশা, এই ছোট ছোট সভাগুলি থেকেই নতুন দাবিগুলি উঠে আসবে।
এই সময়ে, আমরা দেখতে পাচ্ছি, নাগরিক আন্দোলনগুলোর গতিশীলতা পরিবর্তিত হচ্ছে। এটি বোঝা যাচ্ছে যে, রিমঝিম এবং তার দল একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। তারা স্বতঃস্ফূর্ততা বজায় রেখে এবং সংগঠন গড়ে তোলার মাধ্যমে একটি স্থায়ী সামাজিক আন্দোলন তৈরি করতে চায়। বাংলা তথা ভারতবর্ষে নারীদের এই নতুন সামাজিক ভূমিকা নিশ্চিতভাবেই আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিকে পাল্টে দিচ্ছে।
এখন দেখার বিষয় হলো, রিমঝিম ও তার সহযোগীরা তাঁদের লক্ষ্য অর্জনে কতটা সফল হতে পারেন। তবে তারা জানিয়ে দিয়েছেন, এই আন্দোলনটি অব্যাহত থাকবে, এবং তাদের উদ্দেশ্য হলো সামাজিক পরিবর্তন আনয়ন করা।