নবাবিয়ানা থেকে ‘বিলিতি’ সুগন্ধ!
এক সময় আতরের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে উঠত নবাবি আভিজাত্য, মুঘল দরবার, জমিদারবাড়ির সন্ধ্যা কিংবা পুরনো কলকাতার বনেদি সংস্কৃতি। কিন্তু আজকের দিনে সেই আতরই যেন নতুন পরিচয়ের সন্ধানে। বিদেশি পারফিউমের ভিড়ে নিজের অস্তিত্ব বাঁচাতে তাকে নিতে হচ্ছে নতুন কৌশল, বদলাতে হচ্ছে ব্যবসার ভাষাও।
দুনিয়া যখন ‘ও দ্য পারফিউম’, ‘ও দ্য টয়লেট’ বা ‘কোলোন’-এর মতো সুগন্ধির শ্রেণিবিভাগ চিনত না, তখনই আতরের জন্ম। ফুল, মাটি, কাঠ, ঘাস বা বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান থেকে নিষ্কাশিত এই সুগন্ধি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃতির অংশ। তবু আধুনিক শহুরে জীবনে আতর যেন ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে পড়েছিল।
কলকাতার চিৎপুর এলাকার পুরনো আতরের দোকানগুলিতে ঢুকলে সেই পরিবর্তনের ছবি স্পষ্ট ধরা পড়ে। শতাব্দীপ্রাচীন আতর ব্যবসায়ীরা আজ তাঁদের শোকেসে সাজিয়ে রেখেছেন ‘গুচি’, ‘ডায়র’, ‘কেলভিন ক্লেন’, ‘ভিক্টোরিয়াজ় সিক্রেট’ কিংবা ‘শ্যানেল’-এর নামে সুগন্ধি। প্রথম দর্শনে মনে হতে পারে, তাঁরা বিদেশি পারফিউম বিক্রি করছেন। কিন্তু বাস্তবটা অন্য।
এই সুগন্ধিগুলি আসলে আতরেরই নতুন সংস্করণ। বিদেশি ব্র্যান্ডের জনপ্রিয় ঘ্রাণকে অনুকরণ করে আতরের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে সাশ্রয়ী বিকল্প। বহু ক্রেতা আসল বিদেশি পারফিউমের নাগাল পান না বা তার বিপুল দাম দিতে চান না। সেই জায়গাতেই সুযোগ খুঁজে নিয়েছে আতরের ব্যবসা।
চিৎপুরের প্রায় দু’শো বছরের পুরনো আতর ব্যবসায়ী পরিবারগুলির মতে, এটি শুধুই ব্যবসায়িক কৌশল নয়, টিকে থাকার প্রয়োজন। নতুন প্রজন্মের বড় অংশ আর ‘শমামা’, ‘জন্নত-এ-ফিরদৌস’, ‘রূহ গুলাব’ বা ‘দেহন আল উদ’-এর নাম জানে না। কিন্তু তারা ‘ডায়র সাভাজ’ বা ‘গুচি ব্লুম’-এর নাম শুনে আগ্রহী হয়। ফলে ক্রেতাকে দোকানে টানতে পরিচিত নামের আশ্রয় নিতে হচ্ছে।
তবে আতরের নিজস্ব জগৎ এখনও বিস্ময়করভাবে সমৃদ্ধ। মাটির গন্ধমাখা ‘মিট্টি কা আতর’, খাসের শীতল সুবাস, গোলাপের নির্যাস, আগরউডের গভীরতা— এমন বহু সুগন্ধ রয়েছে যার কোনও আধুনিক পারফিউম-সমতুল্য নেই। আতরের সবচেয়ে বড় শক্তি তার প্রাকৃতিক উৎস এবং দীর্ঘস্থায়ী ঘ্রাণ।
তবু সমস্যা অন্য জায়গায়। আজকের বাজারে ‘লাক্সারি’ বলতে অধিকাংশ ক্রেতা বিদেশি ব্র্যান্ড বোঝেন। সামাজিক মাধ্যম, বিজ্ঞাপন এবং বিশ্বায়নের প্রভাবে সুগন্ধির ক্ষেত্রেও ‘বিলিতি’ পরিচয় অনেক সময় গুণমানের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে আতরকে শুধু সুগন্ধি হিসেবেই নয়, নিজের সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়েও লড়তে হচ্ছে।
অদ্ভুত ভাবে, এই লড়াইয়ে আতর হার মানেনি। বরং বদলে যাচ্ছে। পুরনো স্ফটিক-ঢাকনা আতরদানের পাশে জায়গা করে নিচ্ছে আধুনিক কাচের বোতল। নবাবি নামের পাশাপাশি যোগ হচ্ছে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের অনুকরণ। ঐতিহ্য আর বাজার— দুইয়ের মধ্যে এক নতুন সমঝোতা গড়ে উঠছে।
হয়তো এটাই আতরের নতুন যুগ। যেখানে শতাব্দীপ্রাচীন এক সুগন্ধি শিল্প টিকে থাকার জন্য নিজের ভাষা বদলাচ্ছে,
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?