চোরবাগানের সঙ্কীর্ণ গলিতে কী ভাবে পদপিষ্টের পরিস্থিতি?
দুর্গাপুজোর আনন্দ মুহূর্তে বদলে গেল আতঙ্ক আর শোকে। কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসবের মণ্ডপে সপ্তমীর সন্ধ্যায় পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে এক শিশু-সহ ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদন সূত্রে জানা গিয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন। সঙ্কীর্ণ গলি, প্রবল বৃষ্টি, ভিড়ের চাপ এবং মণ্ডপের প্রবেশ ও বেরোনোর পথ নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন। ঠিক কী ভাবে ঘটল এই মর্মান্তিক ঘটনা, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
‘অরব’ থিমের মণ্ডপেই বিপত্তি
২০২৬ সালে চোরবাগান সর্বজনীন (সারদা পার্ক) দুর্গোৎসব সমিতির থিম ছিল ‘অরব’, যার ইংরেজি ব্যাখ্যা ‘বিয়ন্ড সাউন্ড’। শব্দের পরিচিত গণ্ডি পেরিয়ে নীরবতার গভীরে পৌঁছনোর ভাবনা নিয়ে তৈরি হয়েছিল মণ্ডপ। ৩৬০ ডিগ্রির নকশার এই মণ্ডপটি সেরা পুজোর তালিকাতেও জায়গা করে নিয়েছিল।
কিন্তু সেই মণ্ডপের ভিতরের বৃত্তাকার পথ ঘিরেই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিক ভাবে জানা যাচ্ছে। সূত্রের খবর, মণ্ডপে ঢোকার পরে একটি উঁচু বৃত্তাকার করিডর দিয়ে ঘুরে বেরোতে হত দর্শনার্থীদের। ওই অংশে কী ভাবে ভিড় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল, তা তদন্তের বিষয়।
বৃষ্টি থেকে বাঁচতে মণ্ডপে ঢোকার চেষ্টা?
প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের দাবি, সপ্তমীর সন্ধ্যায় উত্তর ও মধ্য কলকাতায় প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়। তখন চোরবাগানের মণ্ডপে ঢোকার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন বহু মানুষ। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে অনেকে দ্রুত ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। এর ফলে ঠেলাঠেলি বাড়ে এবং কয়েক জন বৃত্তাকার পথে পড়ে যান বলে অভিযোগ।
এক প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, পিছন থেকে ক্রমাগত চাপ আসছিল। মণ্ডপের বেরোনোর পথও ছিল সরু। সেখানে চেয়ার রাখা ছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি সামলাতে মাইকে বার বার ঠেলাঠেলি না করার আবেদন জানানো হচ্ছিল বলে জানিয়েছেন কয়েক জন।
মণ্ডপ ভাঙার ঘোষণায় আতঙ্ক ছড়ায়?
প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, এক সময় মাইকে মণ্ডপ ভাঙতে শুরু করেছে বলে ঘোষণা করা হয় এবং দর্শনার্থীদের ফিরে যেতে বলা হয়। তখন বৃষ্টি আরও জোরে নামে। ভিড়ের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে দৌড়তে শুরু করেন, কয়েক জন অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে দাবি। বেরোনোর পথের কাছে একটি প্লাইউডের দেওয়াল ভেঙে পড়েছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে।
তবে এই ঘটনাক্রমের প্রতিটি দিক এখনও স্বাধীন ভাবে নিশ্চিত নয়। দুর্ঘটনার সঠিক কারণ জানতে সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান এবং ঘটনাস্থলের তথ্য খতিয়ে দেখা জরুরি।
নিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন
দুর্ঘটনার পর পুজো উদ্যোক্তা, পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়দের একাংশ। তাঁদের অভিযোগ, সঙ্কীর্ণ গলিতে বিপুল ভিড় সামলানোর মতো পর্যাপ্ত পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন না। প্রবেশপথ দিয়ে দর্শনার্থীদের ঢোকা বন্ধ না করে বেরোনোর পথে ভিড় জমতে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে শনিবার রাতে হাসপাতালে যান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং কলকাতা পুলিশের কমিশনার অজয় নন্দ। আহতদের কয়েক জনকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এসএসকেএম হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদন সূত্রে জানা গিয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ এবং ফরেন্সিক তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের উপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
মৃতদের পরিবারকে আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে মৃতদের পরিবারকে দু’লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। রাজ্য সরকারের তরফে মৃতদের পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকা, এক জন আত্মীয়কে গ্রুপ ডি পদে চাকরি এবং আহতদের পাঁচ লক্ষ টাকা দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
চোরবাগানের ঘটনার পর নিরাপত্তার কারণে আরও কয়েকটি পুজো মণ্ডপে দর্শনার্থীদের প্রবেশ বন্ধ করা হয়েছে। চোরবাগান সংলগ্ন কিছু এলাকায় জমায়েত নিয়ন্ত্রণে বিধিনিষেধও জারি হয়েছে। উৎসবের মাঝখানে এতগুলি প্রাণহানির ঘটনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—কোথায় কী গাফিলতি হয়েছিল, আর ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?।