দিল্লি-বেজিংকে সমান দূরত্বে রেখে চলার কৌশল!
নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় পাঁচ মাস পর ভারত ও চিন—দুই প্রতিবেশী দেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করলেন। একই দিনে দুই দেশের প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কাঠমান্ডু যে ভারসাম্যের কূটনীতির পথে হাঁটতে চাইছে, সেই বার্তাই মিলেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞেরা।
নেপালের বিদেশনীতি দীর্ঘ দিন ধরেই ভারত ও চিনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার নীতির উপর নির্ভরশীল। নতুন প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহের সাম্প্রতিক পদক্ষেপেও সেই প্রবণতারই ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। সরকার গঠনের পর এত দিন বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক এড়িয়ে চললেও এ বার অবস্থান বদলেছেন তিনি।
সোমবার কাঠমান্ডুতে প্রথমে ভারতের রাষ্ট্রদূত নবীন শ্রীবাস্তবের সঙ্গে বৈঠক করেন বলেন্দ্র। পরে চিনের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন তিনি। একই দিনে দুই প্রতিবেশী দেশের প্রতিনিধির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠককে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে কূটনৈতিক মহল।
নেপালের ভৌগোলিক অবস্থানও এই ভারসাম্যের নীতির অন্যতম কারণ। এক দিকে ভারত, অন্য দিকে চিন—দুই শক্তিধর দেশের মাঝখানে থাকা নেপালের পক্ষে কোনও একটি দেশের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা তৈরি করা কূটনৈতিক ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারতের গুরুত্ব নেপালের কাছে অত্যন্ত বেশি। সমুদ্রবন্দরে পৌঁছনোর জন্য ভারতের ভূখণ্ডের উপর নির্ভর করতে হয় নেপালকে। ফলে নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক একেবারে খারাপ করতে চাইছে না কাঠমান্ডু।
তবে ভারত-নেপাল সম্পর্কে সীমান্ত-সংক্রান্ত কিছু জটিলতা এখনও রয়েছে। লিপুলেখ গিরিপথ তার অন্যতম। ভারত ও চিন ওই পথ দিয়ে ফের বাণিজ্য চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর নেপালের সামনে নতুন করে কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
লিপুলেখ, কালাপানি এবং লিম্পিয়াধুরাকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে আসছে নেপাল। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি মানচিত্র নিয়েও নয়াদিল্লি ও কাঠমান্ডুর মধ্যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল। ভারত অবশ্য নেপালের ওই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
এর আগেও ২০১৫ সালে ভারত-নেপাল সম্পর্কে বড় ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল। সে সময় নেপালের নতুন সংবিধান ঘিরে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। সীমান্তে বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ার অভিযোগও তুলেছিল কাঠমান্ডু।
বলেন্দ্র নিজেও কাঠমান্ডুর মেয়র থাকাকালীন ভারত-নেপাল সীমান্ত নিয়ে সরব হয়েছিলেন। ‘বৃহত্তর নেপাল’-এর মানচিত্র প্রদর্শন এবং ভারতীয় ছবির উপর নিষেধাজ্ঞার মতো পদক্ষেপ তাঁর ভারত-সংক্রান্ত কঠোর অবস্থানের পরিচয় দিয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও তাঁর সেই অবস্থানের প্রতিফলন দেখা যায়। চলতি বছরের মে মাসে ভারতের বিদেশসচিব বিক্রম মিস্রীর নেপাল সফর বাতিল হওয়াকে ঘিরেও কূটনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়।
কূটনৈতিক সূত্রের দাবি ছিল, সমমর্যাদার ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনাতেই বেশি আগ্রহী ছিলেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী। অর্থাৎ বিদেশসচিবের পরিবর্তে সরাসরি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার প্রত্যাশা ছিল তাঁর।
তবে সেই টানাপড়েনের পরেও নয়াদিল্লি আলোচনার মাধ্যমে নেপালের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার বার্তা দিয়েছে। সীমান্ত-সহ দ্বিপাক্ষিক সমস্ত সমস্যা আলোচনার টেবিলেই সমাধানের পক্ষে ভারত।
অন্য দিকে, চিনের সঙ্গেও সম্পর্ক ছিন্ন করার কোনও ইচ্ছা নেই নেপালের। তবে বেজিংয়ের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ ঘিরে আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে নতুন সরকার।
উচ্চ সুদের বাণিজ্যিক ঋণের বদলে অনুদান বা সহজ শর্তের অর্থায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতির কথা উঠে এসেছে। এর মাধ্যমে চিনের ঋণের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এড়াতে চাইছে কাঠমান্ডু—এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
নেপালের নতুন সরকারের বিদেশনীতিতে আমেরিকা ও চিনের বিভিন্ন কৌশলগত উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে কোনও সামরিক বা কৌশলগত জোটে না গিয়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছেন সরকারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা।
নেপালের প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী বিমলা রায় পাউডিয়ালের মতে, পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে দেশের বিদেশনীতির অগ্রাধিকার নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
আরএসপি-র আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সদস্য বিক্রম তিমিলসিনাও জাতীয় স্বার্থ ও সংবিধানকে বিদেশনীতি পরিচালনার মূল ভিত্তি করার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, নেপালের উচিত কোনও বৃহৎ শক্তির কৌশলগত জোটে জড়িয়ে না পড়ে বাস্তবসম্মত অবস্থান নেওয়া।
ফলে বলেন্দ্র শাহের সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে অনেকেই নেপালের ‘ভারসাম্যের কূটনীতি’র প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখছেন। একই দিনে ভারত ও চিনের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কাঠমান্ডু যেন দুই প্রতিবেশীকেই সমান গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা দিল।
তবে এই ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হবে না। লিপুলেখের মতো সীমান্ত-প্রশ্ন, চিনের পরিকাঠামো প্রকল্প, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক নির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির চাপ—সব মিলিয়ে বলেন্দ্র সরকারের সামনে কঠিন কূটনৈতিক পরীক্ষা অপেক্ষা করছে।
শেষ পর্যন্ত ভারত ও চিন—দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও নেপালের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত রাখা যায়, সেটাই নতুন সরকারের বিদেশনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?।