লরেন্স বিশ্নোইয়ের অপরাধচক্রের ভয়াবহতা
ভারতের কুখ্যাত গ্যাংস্টার লরেন্স বিশ্নোই, দীর্ঘদিন ধরে জেলবন্দি থাকলেও অপরাধমূলক কার্যকলাপ থামিয়ে রাখেননি। তার অপরাধ জগতের বিস্তার শুধু ভারতে নয়, বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি, মুম্বাইয়ের বান্দ্রা এলাকায় এনসিপি নেতা তথা মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মন্ত্রী বাবা সিদ্দিকিকে খুনের ঘটনায় ফের সামনে আসে বিশ্নোইয়ের নাম। বিশ্নোইয়ের দল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ্যে এই খুনের দায় স্বীকার করে।

লরেন্স বিশ্নোইয়ের অপরাধের দীর্ঘ তালিকা
বিশ্নোইয়ের নাম প্রথম আলোচনায় আসে পাঞ্জাবি গায়ক সিধু মুসে ওয়ালা হত্যাকাণ্ডের পর। সেই থেকে শুরু করে বলিউড তারকা সলমন খানকে হত্যার হুমকি দেওয়া, তার গ্যাং বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত। বিশ্নোই বর্তমানে গুজরাটের সাবরমতি জেলে বন্দি, তার আগে তিনি দিল্লির তিহার জেলে ছিলেন। কিন্তু তাতে তার অপরাধ কর্মকাণ্ডের কোনো বাধা তৈরি হয়নি। বরং কারাগার থেকেই বিভিন্ন ধরণের অপরাধের নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন বিশ্নোই।

‘ডাব্বা কলিং’ এবং নতুন অপরাধ পদ্ধতি
কয়েক মাস ধরে দিল্লি, পাঞ্জাব, হরিয়ানা এবং রাজস্থানসহ বিভিন্ন রাজ্যে ‘ডাব্বা কলিং’ নামে নতুন একটি অপরাধ পদ্ধতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে পুলিশকে। বিদেশে বা জেলে বসে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে বিশ্নোইয়ের গ্যাং তোলাবাজি করে যাচ্ছে। ডাব্বা কলিং-এর মাধ্যমে, তারা মোবাইলের ইন্টারনেট ব্যবহার করে স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে বিত্তশালীদের হুমকি দেয়। তারপর বিদেশে বা জেলে বসে থাকা গ্যাংয়ের বস অপরাধের মূল নির্দেশ দেয়।
এই প্রক্রিয়ায়, দুটি মোবাইল স্পিকারে রেখে একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়। ফলে ফোনে সরাসরি কোনো অপরাধীর কথা শোনা যায় না, শুধু একটি মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে কথা বলা হয়। এ কারণে তদন্তকারীরা এ ধরণের ফোন ট্র্যাক করতে গিয়ে চরম সমস্যায় পড়েন। এ ধরনের অপরাধীদের চিহ্নিত করাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, কারণ তারা বেশিরভাগ সময় ‘ভিপিএন’ বা ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে, যা তাদের আসল অবস্থান গোপন রাখে।

বিশ্নোই গ্যাংয়ের বিস্তার এবং হুমকি
বিশ্নোই গ্যাংয়ের প্রভাব শুধু ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তারা কানাডা এবং অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্নোই, গোল্ডি ব্রার, রোহিত গোদারা এবং আনমোল বিশ্নোইয়ের মতো দুষ্কৃতীদের নাম এই গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত। এরা তোলাবাজি থেকে শুরু করে খুন পর্যন্ত নানা অপরাধে লিপ্ত রয়েছে। যে সমস্ত ব্যক্তিদের থেকে টাকা চাওয়া হয়, তাদের মধ্যে বড় ব্যবসায়ী, নির্মাতা, ঠিকাদার, গাড়ি ব্যবসায়ী, ক্লাব বা হোটেলের মালিক এবং এমনকি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাও রয়েছেন।
গত বছরের ডিসেম্বরে দক্ষিণপন্থী নেতা সুখদেব সিংহ গোগামেডিকে খুন করা হয়, তার পেছনেও ছিল বিশ্নোই গ্যাং। এমনকি পাঞ্জাবি গায়ক গিপ্পি গ্রেওয়ালের কানাডার ভ্যাঙ্কুভারের বাড়িতে হামলার ঘটনায়ও জড়িত ছিল এই গ্যাং। বিশ্নোই এবং তার দলের সদস্যদের অপরাধ কার্যকলাপ এতটাই বিস্তৃত যে, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলি তাদের ১৯৯৩ সালের মুম্বাই বিস্ফোরণের মাস্টারমাইন্ড দাউদ ইব্রাহিমের ‘ডি কোম্পানি’র সঙ্গে তুলনা করছে।

সলমন খানকে কেন হত্যা করতে চায় বিশ্নোই?
বিশ্নোই গ্যাংয়ের বিশেষভাবে বলিউড সুপারস্টার সলমন খানের বিরুদ্ধে শত্রুতা কেন, তা নিয়ে নানা গুঞ্জন রয়েছে। এর মূল কারণ ১৯৯৮ সালে রাজস্থানের জোধপুরে ঘটে যাওয়া কৃষ্ণসার হরিণ হত্যার ঘটনা। সলমন খান ওই সময় ‘হাম সাথ সাথ হ্যায়’ ছবির শুটিং করছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে কৃষ্ণসার হরিণ হত্যার অভিযোগ আনা হয়। বিশ্নোই সম্প্রদায়ের কাছে কৃষ্ণসার হরিণ পবিত্র, ফলে এই হত্যাকাণ্ড তাদের ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করে। ২০১৮ সালে গ্রেফতারের পর আদালতে দাঁড়িয়ে বিশ্নোই ঘোষণা করেন যে, তিনি জোধপুরে সলমন খানকে হত্যা করবেন।
তখন থেকেই বিশ্নোই এবং তার দলের সদস্যরা সলমনের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা করে আসছে। ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে, সলমনের বান্দ্রার বাড়ির সামনে হামলার চেষ্টাও হয়, যদিও অভিনেতার কোনো ক্ষতি হয়নি। সম্প্রতি, বিশ্নোই গ্যাংয়ের এক সদস্য এপি ধিঁলোর বাড়ির সামনে গুলি চালানোর ঘটনার দায় স্বীকার করেন এবং জানান যে, ধিঁলোর এক গানের ভিডিওতে সলমনকে দেখা গিয়েছিল বলেই এই হামলা হয়।

জেলে থেকেও অপরাধ সাম্রাজ্যের নেতৃত্ব
বিশ্নোই দীর্ঘদিন ধরে জেলে থাকা সত্ত্বেও তার অপরাধমূলক সাম্রাজ্য দিব্যি চলছে। তার নির্দেশেই দেশজুড়ে বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এমনকি তার গ্যাংয়ের সদস্যরা বিদেশ থেকে ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রোটোকল (ভিওআইপি) ব্যবহার করে ভারতে ফোন করে তোলাবাজি করছে। যেহেতু ভিওআইপি কলের মাধ্যমে তাদের অবস্থান চিহ্নিত করা যায় না, তাই তদন্তকারীদের কাছে এই অপরাধীদের খুঁজে বের করাটা খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্নোই এবং তার দলের সদস্যরা অপরাধ সংঘটিত করতে বিশেষ ধরণের অ্যাপ ব্যবহার করে, যা ‘এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন’ সুরক্ষা প্রদান করে। ফলে অপরাধীদের কার্যকলাপ ও তথ্য সুরক্ষিত থাকে, আর তাদের ট্র্যাক করা তদন্তকারীদের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। যদিও পুলিশ মাঝে মাঝে অপরাধীদের সিম কার্ডের সূত্র ধরে তাদের অবস্থান চিহ্নিত করতে পারে, কিন্তু ততক্ষণে তারা অন্য কোথাও পালিয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই সিম কার্ড জাল নথি ব্যবহার করে কেনা হয়, যা অপরাধীদের খুঁজে বের করার কাজে আরও জটিলতা সৃষ্টি করে।

বিশ্নোই গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ
ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলি বিশ্নোই গ্যাংকে ঠেকাতে নানা ধরনের আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলাও চলমান। তবে, বিশ্নোই গ্যাংয়ের অপরাধের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এবং তাদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে আইনি পদক্ষেপ নেওয়াও চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্নোই এবং তার গ্যাংয়ের অপরাধমূলক কার্যকলাপ উত্তর ভারতজুড়ে ত্রাস সৃষ্টি করেছে। পাঞ্জাব, হরিয়ানা এবং রাজস্থানের মতো রাজ্যগুলোতে বিশ্নোই গ্যাংয়ের প্রভাব ভয়ানক। যদিও পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে, তবুও তাদের অপরাধ সাম্রাজ্য এখনো থামানো সম্ভব হয়নি।
বিশ্নোই গ্যাং এবং ভবিষ্যৎ অপরাধ
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিশ্নোই গ্যাংয়ের কার্যকলাপ ভবিষ্যতে আরও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে, তারা যে প্রযুক্তিগত কৌশল এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার সাহায্যে অপরাধ চালাচ্ছে, তাতে তদন্তকারীদের পক্ষে তাদের থামানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
উল্লেখ্য, বিশ্নোই গ্যাংয়ের নেতা লরেন্স বিশ্নোই এবং গোল্ডি ব্রারের যুগলবন্দি ডি কোম্পানির মতোই একটি অপরাধ নেটওয়ার্ক তৈরি করছে, যা শুধু ভারত নয়, গোটা বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত।