জ়ুবিনের প্রয়াণে মন ভরা শোক!
এই বছর দুর্গাপুজোর হিড়িক অন্যরকম। কলকাতা নয়, দেশ বা অন্য কোনো শহরও নয়—অসমই টানল ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়কে। ষষ্ঠীর দিন বাবা-সঙ্গে মেঘালয়ে পৌঁছলেন তিনি। পা রাখতেই মনটা ভারী হয়ে উঠল। মেঘালয়ে দুর্গাপুজোর কোনো উৎসব বা রঙিন শোরগোল নেই। অফিস, স্কুল—সবই খোলা। রাস্তার দু’ধারে পিঠে ব্যাগ বহন করে ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাচ্ছিল।
শিলং, চেরাপুঞ্জি, কাজিরাঙা, গুয়াহাটি—যাত্রাপথে ভাস্বরের চোখে দৃশ্যপট ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে। শিলংয়ের নিরিবিলি পরিবেশে বাতাসে হালকা শিরশিরানি। চেরাপুঞ্জিতে বিরামহীন বৃষ্টি, ঝিরঝির শব্দে প্রকৃতির মৃদু সঙ্গীত। গুয়াহাটি শহরে পা রাখতেই মন চনমনে। একশো পঞ্চাশের বেশি মণ্ডপ, একের পর এক প্রদীপের আলো আর অষ্টমীর সন্ধিপুজোর আয়োজন—চণ্ডীপাঠ, অঞ্জলির মন্ত্র সবই সেখানে। মেখলা সুন্দরী মহিলারা তাদের রূপে মণ্ডপ সাজাচ্ছেন, ছেলেরা পাজামা-পাঞ্জাবি বা ক্যাজুয়াল পোশাকে ছিমছাম। খাবারে বাঙালিয়ানা ভরপুর—ভাতের সঙ্গে দুই ধরনের ডাল, শাকভাজা, তরকারি, পাঁপড় এবং পায়েস।
তবু এই আনন্দের মাঝেও শূন্যতার অনুভূতি। জ়ুবিন গার্গের প্রয়াণে অসমবাসী শোকমগ্ন। রাস্তা-ঘাটে তাঁর ছবি, মণ্ডপে বাজছে গান—জানিয়ে দিচ্ছে, তাঁর উপস্থিতি অনুপস্থিত। শহরে যেন প্রাণের সাড়া নেই। দুর্গার মুখেও এই বছর বিশেষ বাঙালিয়ানা নেই; প্রতিমাগুলো অসমিয়াদের রীতি অনুযায়ী তৈরি।
পুজো দেখার পাশাপাশি ভাস্বর গিয়েছিলেন কাজিরাঙার জঙ্গলে। চোখের সামনে একদল গন্ডার—প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি সংযোগে মুগ্ধতা। সমাধিস্থলও পরিণত হয়েছে তীর্থক্ষেত্রে। প্রতিদিন শত শত অনুরাগী আসছেন। প্রত্যেকের হাতে একটি করে গাছের চারা, যা তিনি বা তার পরিবার জ়ুবিনের স্মৃতিতে রোপণ করছেন। বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে প্রয়াত শিল্পীকে অমর রাখার উদ্যোগ যেন গোটা অসমজুড়ে ছড়িয়ে গেছে।
মেঘালয়ের নিরিবিলি পরিবেশ, কাজিরাঙার প্রকৃতি, এবং জ়ুবিনের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা—সব মিলিয়ে এই পুজো অন্য বছরের থেকে ভিন্ন। আনন্দ থাকলেও শোকও ছায়ার মতো স্পর্শ করছে প্রতিটি মুহূর্তে। দুর্গাপুজো যেন এক তীর্থযাত্রা, যেখানে মানুষের হৃদয়ে জ়ুবিনের গান, স্মৃতি এবং তাঁর প্রতি শ্রদ্ধার ছোঁয়া মিশে গেছে।