কানাডার ব্রাম্পটনে মন্দিরে হিংসার ঘটনায়
কানাডার ব্রাম্পটন শহরের হিন্দু সভা মন্দিরে ঘটে গেল এক চাঞ্চল্যকর হিংসাত্মক ঘটনা। খলিস্তানপন্থী সমর্থকদের বিরুদ্ধে মন্দিরের ভক্তদের হেনস্থা করার অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে সমগ্র ভারতীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। এই ঘটনায় পুলিশ গ্রেফতার করেছে ইন্দ্রজিৎ সিংহ গোসাল নামে এক ব্যক্তিকে, যিনি কানাডায় খলিস্তানপন্থী সংগঠন ‘শিখ ফর জাস্টিস’-এর সমন্বয়ক হিসাবে কাজ করতেন।
ঘটনার বিবরণ ও অভিযুক্তের পরিচয়
৩৫ বছর বয়সি ইন্দ্রজিৎ সিংহ গোসাল ব্রাম্পটনের বাসিন্দা। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ৩ নভেম্বর ব্রাম্পটনের গোর রোডের হিন্দু সভা মন্দিরের সামনে ভক্তদের আক্রমণ ও হেনস্থা করা হয়, যা নিয়ে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়েছে। এছাড়া, মন্দিরের বাইরে ভারতীয় উপদূতাবাসের একটি সাময়িক শিবিরেও হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কানাডার পুলিশ এবং কৌশলগত তদন্তকারী দল (সিট) এই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে গোসালকে শনাক্ত করে এবং ৮ নভেম্বর তাঁকে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করা হয়।
গোসাল কানাডার এক সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, তিনি খলিস্তানপন্থী আন্দোলনের সক্রিয় সদস্য, এবং তাঁর বিরুদ্ধে আগে থেকে নানাভাবে হুমকি রয়েছে। তাঁর কথায়, এ বছরের শুরুর দিকে তাঁর বাসভবনকে লক্ষ্য করেও গুলি চালানো হয়েছিল, যা তাঁর জীবনের ওপর হামলার দৃষ্টান্ত বলে তিনি দাবি করেন।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং প্রতিবাদের মুখ্য লক্ষ্য
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গোসাল বলেন যে, তাদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল ভারত সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো। তাঁর দাবি অনুযায়ী, “এই লড়াই হিন্দু ও শিখদের মধ্যে নয়, বরং ভারত সরকারের বিরুদ্ধে।” তবে মন্দিরে হামলা ও ভক্তদের হেনস্থা নিয়ে জনমনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে এবং এই বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনও দায় স্বীকার করেননি।
তবে এই ধরনের হিংসাত্মক ঘটনায় স্থানীয় ভারতীয় সম্প্রদায়, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়, অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। মন্দিরে প্রার্থনা করতে যাওয়া ভক্তদের হেনস্থা করা হয় এবং এমনকি মহিলারা ও শিশুরাও এই হামলার শিকার হন বলে অভিযোগ উঠেছে। ৫৭ বছর বয়সি রণেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায় নামে আরেক ব্যক্তিকেও এই ঘটনায় প্ররোচনা দেওয়ার দায়ে গ্রেফতার করা হয়েছে।
১৯৮৪ সালের শিখ-বিরোধী হিংসার প্রতিবাদ ও খলিস্তানপন্থীদের বিক্ষোভ
ঘটনার দিনে বেশ কিছু খলিস্তানপন্থী সমর্থক ১৯৮৪ সালের শিখ-বিরোধী হিংসার প্রতিবাদে মন্দিরের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তারা খলিস্তান আন্দোলনের পতাকা ও লাঠি হাতে মন্দিরের প্রবেশপথে অবস্থান নেন। ভক্তরা মন্দিরে প্রবেশ করতে গেলে তাদের বাধা দেওয়া হয় এবং পরিস্থিতি তীব্র হয়ে ওঠে। অভিযোগ, খলিস্তানপন্থীরা মন্দিরে ঢোকার চেষ্টা করা ভক্তদের উপর চড়াও হয় এবং শারীরিকভাবে আঘাত করে। মহিলাদেরও শারীরিকভাবে হেনস্থা করার অভিযোগ উঠেছে, যা ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর গুরুতর আঘাত বলে মনে করছেন অনেকে।
এছাড়া, মন্দিরের বাইরেই ভারতীয় উপদূতাবাসের শিবিরে উপস্থিত ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তার দায়িত্বেও সমস্যা তৈরি হয়। উপদূতাবাসের এই শিবিরে খলিস্তানপন্থী সমর্থকরা হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনাকে ঘিরে ভারতীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ বৃদ্ধি পায় এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোও এই ঘটনার নিন্দা করেছেন।
কানাডার প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় সহাবস্থানের সঙ্কট
কানাডায় সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় সম্প্রদায় এবং বিশেষ করে হিন্দু ও শিখদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে উত্তেজনা বাড়ছে। দেশটির শিখ সম্প্রদায়ের মধ্যে কিছু অংশ খলিস্তানপন্থী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠেছে, যা হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি করছে। কানাডার সমাজে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের যে নীতি এতদিন ধরে বিরাজ করছিল, সাম্প্রতিক এই ঘটনা সেই পরিবেশকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
কানাডার পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার জানিয়েছে যে, এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে তারা আরও কড়া ব্যবস্থা নেবে এবং সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের শান্তি বজায় রাখতে সচেষ্ট থাকবে। তবুও, ভারতীয় সম্প্রদায়ের সদস্যরা চান, কানাডা সরকার আরও কঠোরভাবে এই ধরনের হিংসাত্মক প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করুক।
এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও, ভারতীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে কিছুটা আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।