কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রণব-কন্যা শর্মিষ্ঠার ক্ষোভ!
প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের কন্যা শর্মিষ্ঠা মুখোপাধ্যায় আবারও তাঁর পুরনো রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের দিকে তোপ দাগলেন। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের স্মৃতিসৌধ নির্মাণের দাবিকে ঘিরে চলমান বিতর্কে এ বার তিনি সরাসরি অভিযোগ আনলেন কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বিরুদ্ধে।
শর্মিষ্ঠার অভিযোগ
শুক্রবার রাতে শর্মিষ্ঠা সমাজমাধ্যমে একটি পোস্টে লিখেছেন, ২০২০ সালে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি কোনও শোকসভা করেনি। তিনি বলেন, ‘‘আমার বাবা প্রয়াত হওয়ার পরে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির একটি শোকসভাও হয়নি। দলের এক প্রবীণ নেতা আমাকে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতিদের ক্ষেত্রে এমন শোকসভা হওয়ার কোনও রীতি নেই। তবে সেই দাবি ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা।’’ শর্মিষ্ঠা জানান, বাবার ডায়েরিতে তিনি নিজেই উল্লেখ পেয়েছেন যে, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি কেআর নারায়ণনের মৃত্যুতে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির শোকসভা ডেকে শোকপ্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। সেই শোকবার্তা নিজেই লিখেছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়।
মনমোহন সিংহের স্মৃতিসৌধ-বিতর্ক
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতিসৌধ নির্মাণের দাবিকে ঘিরে বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে চলমান তরজা নতুন মাত্রা পেয়েছে। মনমোহনের শেষকৃত্য কোথায় হবে, তা নিয়েও মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। কংগ্রেস দাবি করেছে, দিল্লিতে রাজঘাটের পাশে কোনও স্থানে মনমোহনের শেষকৃত্য হওয়া উচিত, যেখানে ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী ও অটলবিহারী বাজপেয়ীর মতো নেতাদের স্মৃতিসৌধ রয়েছে।
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে মনমোহনের শেষকৃত্যের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে অনুরোধ জানান। প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢরা এবং কেসি বেণুগোপালও প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তবে কেন্দ্র এই অনুরোধ উপেক্ষা করে মনমোহনের শেষকৃত্য দিল্লির নিগমবোধ ঘাটে করার সিদ্ধান্ত নেয়।
শর্মিষ্ঠার রাজনৈতিক অতীত এবং বর্তমান অবস্থান
২০১৪ সালে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেওয়া শর্মিষ্ঠা মুখোপাধ্যায় কংগ্রেসের হয়ে দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনে অংশ নেন। তবে গ্রেটার কৈলাস আসন থেকে আম আদমি পার্টির প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। ২০১৯ সালে তিনি কংগ্রেসের জাতীয় মুখপাত্র হন। কিন্তু ক্রমশ দলের সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকে। ২০২১ সালে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসরের ঘোষণা দেন।
শর্মিষ্ঠার অভিযোগ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের ক্ষোভের ইঙ্গিত বহন করে। তিনি আগেও বলেছিলেন, দলের কিছু পদক্ষেপ তাঁর পিতা প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মনঃপূত হয়নি। বিশেষত, ২০১৩ সালে রাহুল গান্ধীর প্রকাশ্যে একটি অর্ডিন্যান্স ছিঁড়ে ফেলার ঘটনাটি উল্লেখ করে শর্মিষ্ঠা বলেছিলেন, প্রণবের কাছে এটি অপমানজনক ছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
শর্মিষ্ঠার এই মন্তব্য অনেকটাই কংগ্রেসের সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গেকে ইঙ্গিত করে করা হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। দলের অভ্যন্তরে শীর্ষ নেতৃত্বের আচরণ এবং সিদ্ধান্ত প্রণবের মতো প্রবীণ নেতাদেরও সম্মান দিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে শর্মিষ্ঠার বক্তব্য তুলে ধরেছে।
বিজেপি-কংগ্রেস বিতর্ক
এই প্রসঙ্গে বিজেপি কংগ্রেসের দিকে আঙুল তুলে বলেছে, কেন ইউপিএ জমানায় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী পিভি নরসিংহ রাওয়ের শেষকৃত্য দিল্লিতে হয়নি এবং কেন তাঁর স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়নি। পাল্টা যুক্তি দিতে গিয়ে বিজেপি মনে করিয়ে দিয়েছে, মোদী সরকারের আমলে নরসিংহ রাওয়ের স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে এবং তাঁকে মরণোত্তর ভারতরত্ন প্রদান করা হয়েছে।
পরিণতি
শর্মিষ্ঠা মুখোপাধ্যায়ের এই বক্তব্য কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে একটি কঠিন প্রশ্ন তুলেছে। প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মতো প্রভাবশালী নেতার প্রতি দল যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়েছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। পাশাপাশি, মনমোহনের স্মৃতিসৌধ নিয়ে রাজনৈতিক তরজায় শর্মিষ্ঠার মন্তব্য একটি নতুন অধ্যায় যোগ করল।
এই ঘটনা কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা এবং নেতৃত্বের প্রতি বিশ্বাসের অভাবকে সামনে এনেছে, যা দলের ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।