বাঙালি-বিরোধী তকমা মুছতে বইমেলায় অভিনব কৌশল
কলকাতা বইমেলা—বাঙালির আবেগ, সংস্কৃতি আর সৃজনশীলতার সবচেয়ে বড় উদযাপন। কিন্তু এই মেলার আঙিনায় বারবার হাজির হয়েও বিজেপি-আরএসএস শিবিরের গা থেকে ‘বাঙালি-বিরোধী’ তকমা যেন কিছুতেই মুছছিল না। তাঁদের স্টলকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদ, স্লোগান কিংবা বিক্ষোভ—এ সব যেন রুটিনমাফিক ঘটনা হয়ে উঠেছিল। তবে ২০২৫ সালের বইমেলায় তারা এক অভিনব কৌশল নিয়েছে। বিজেপি-নিয়ন্ত্রিত পাক্ষিক ‘ভারতীয় জনবার্তা’র স্টল এ বার আর স্টল নয়। বলা হচ্ছে, ‘‘দোচালা’’।
স্টল নয়, কেন দোচালা?
২০১৪ সাল থেকে বইমেলায় স্টল বসিয়ে আসছে বিজেপি শিবির। কিন্তু এ বছর স্টলকে হঠাৎ দোচালা বলার সিদ্ধান্ত কেন? বইমেলায় বিজেপি-ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন সংগঠনের স্টল ঘিরে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের অভিজ্ঞতা তাদের নতুন ভাবনার কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও ‘ভারতীয় জনবার্তা’র কার্যকরী সম্পাদক সাধন তালুকদার দাবি করেছেন, ‘‘এটা কোনো প্রতিক্রিয়া নয়। বাংলা ভাষার মাধুর্যের প্রতি ভালবাসা থেকেই স্টলের বদলে দোচালা নাম রাখা হয়েছে। স্টল তো ইংরেজি শব্দ, যখন এত সুন্দর বাংলা প্রতিশব্দ রয়েছে, সেটাই কেন ব্যবহার করব না?’’
দলের রাজ্য নেতৃত্বের একাংশ অবশ্য বলছেন, এটা বিজেপির বাঙালিয়ানা জাহির করার সাম্প্রতিক প্রয়াসেরই অংশ। কালীপুজোতে শুভেচ্ছা জানানো, পয়লা বৈশাখ পালন, আমিষ খাবারের আয়োজন—সব মিলিয়ে ‘বাঙালি-বিরোধী’ অপবাদ ঘোচানোর চেষ্টা বইমেলা পর্যন্ত পৌঁছেছে।
‘দোচালা’র সুরে বাঙালিয়ানা জোরালো করতে চায় বিজেপি
বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে ‘বহিরাগত’ বলে অভিযুক্ত হয়ে আসছে। রাজ্য বিজেপি সভাপতি সুকান্ত মজুমদারের মতে, ‘‘বিজেপি ভারতব্যাপী একমাত্র দল, যা একজন বাঙালির (শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়) হাতে প্রতিষ্ঠিত।’’ সুকান্তের দাবি, বাংলার মানুষ বিজেপিকে আপন বলেই ভোট দিচ্ছেন। ২০১৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত রাজ্যে বিজেপির ভোটের পরিমাণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘আমরা ২ কোটি ৩৩ লক্ষ বাঙালির ভোট পেয়েছি। এটাই প্রমাণ করে যে বাঙালিরা আমাদের আপন মনে করেন।’’
বিরোধীদের কটাক্ষ: নাম পাল্টালেও মন বদলাবে না
তৃণমূল এবং সিপিএমের মতে, বিজেপি যতই নাম বদল করুক, তাতে তাদের ভাবমূর্তি পাল্টাবে না। তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ বলছেন, ‘‘স্টলকে দোচালা বললে বাঙালির মন জেতা যাবে না। বাঙালির সংস্কৃতি আর বিজেপির আদর্শ একেবারে বিপরীত।’’ সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম তির্যকভাবে বলেন, ‘‘দোচালা নয়, আটচালা করলেও কিছু যায়-আসে না। বাংলার সাংস্কৃতিক চেতনা নবজাগরণের মধ্য দিয়ে তৈরি। বিজেপি-আরএসএস যা করে, তা নবজাগরণের চেতনার উল্টো।’’
তৃণমূল-বিজেপি সংঘাত বইমেলার মঞ্চেও স্পষ্ট
তৃণমূলের দাবি, বিজেপি বঙ্গসংস্কৃতি থেকে বহু দূরে থাকা দল। এমনকি, বইমেলার মতো বাঙালির অন্যতম বড় উৎসবেও তাদের স্টল ঘিরে প্রতিবাদের ঘটনা ঘটে। গত কয়েক বছর ধরে এই প্রবণতা আরও জোরালো হয়েছে। সিপিএমের কথায়, ‘‘বইমেলায় দোচালা বললেও বাংলার সাংস্কৃতিক মঞ্চে বিজেপি-আরএসএস পরিবারের গ্রহণযোগ্যতা সহজে আসবে না।’’
দোচালা নামের পিছনের বার্তা
এত বছর পরে কেন স্টলের নাম দোচালা রাখা হল, তা নিয়ে জনমনে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। বিজেপি যদিও এটিকে ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি তাদের শ্রদ্ধার বিষয় বলেই তুলে ধরতে চাইছে, বিরোধীরা বলছেন, এটি নিছকই রাজনৈতিক চমক। তবে সাধারণ বইপ্রেমীদের একটা বড় অংশের মতে, নাম পাল্টানো এক জিনিস, আর মন থেকে বাঙালিয়ানা আত্মস্থ করা আরেক।
এখন দেখার, ‘দোচালা’ নামকরণ আদৌ বিজেপি-আরএসএস পরিবারকে বাঙালির মনে আলাদা জায়গা করে দিতে পারে কি না। বইমেলা শেষে এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো কিছুটা মিলবে। তবে আপাতত মেলার দর্শনার্থীরা বিজেপির নতুন কৌশলের দিকে কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে রয়েছেন।
ঠাণের সেই হাসপাতালেই জন্মদিন পালন কাম্বলির, সঙ্গী চিকিৎসক, নার্সেরা