গাজ়া যুদ্ধের অভিঘাত কি সিডনির বন্ডি সৈকতে?
সিডনির বন্ডি সৈকত সাধারণত আনন্দ, আলো আর সমুদ্রের ঢেউয়ের প্রতীক। কিন্তু হানুকার উৎসবের দিনে সেই সৈকতই সাক্ষী থাকল এক ভয়াবহ হত্যালীলার। উৎসবের ভিড়ে ঢুকে দুই বন্দুকবাজ নির্বিচারে গুলি চালায়। মুহূর্তে লুটিয়ে পড়েন বহু মানুষ। প্রাণ হারান অন্তত ১৬ জন, আহত আরও অনেক। এই হামলায় শুধুই কি কয়েকজন নিরীহ মানুষ মারা গেলেন, নাকি তার চেয়েও গভীর কোনও বার্তা দিতে চেয়েছিল আততায়ীরা—এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী এই ঘটনাকে “শয়তানের কাজ” বলে আখ্যা দিয়েছেন। তদন্তে নেমে পুলিশ জানিয়েছে, হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ইহুদি সম্প্রদায়। আততায়ীরা সম্পর্কে পিতা ও পুত্র, এবং তাঁদের মধ্যে দীর্ঘদিনের ইহুদি-বিদ্বেষ কাজ করছিল বলেই প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক জঙ্গি মতাদর্শ বা সাম্প্রতিক পশ্চিম এশিয়ার অস্থির পরিস্থিতির কোনও যোগ রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই হামলার প্রেক্ষাপট বুঝতে গেলে চোখ ফেরাতে হয় গাজ়ার দিকে। গত দু’বছরের বেশি সময় ধরে চলা গাজ়া যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ উঠেছে, আবার ইজ়রায়েলের দাবি—তারা সন্ত্রাসী সংগঠন হামাসের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। এই সংঘাতের মাঝখানে পড়ে সাধারণ প্যালেস্টাইনি নাগরিকদের দুর্ভোগ, মৃত্যু আর খাদ্যসংকট আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বিশ্বের নানা প্রান্তে—ইজ়রায়েলবিরোধী বিক্ষোভ, প্রতিবাদ, এবং দুঃখজনক ভাবে, ইহুদি বিদ্বেষের বৃদ্ধিতে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, গাজ়া যুদ্ধ যত তীব্র হয়েছে, ততই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী ইহুদিরা প্রতিশোধমূলক ঘৃণার লক্ষ্য হয়ে উঠেছেন। বন্ডি সৈকতের হামলাও সেই ধারারই ভয়াবহ উদাহরণ হতে পারে। উৎসবের দিন বেছে নেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল একসঙ্গে যত বেশি সম্ভব ইহুদিকে হত্যা করা—এমনটাই মনে করছেন তদন্তকারীরা। ইতিহাসেও দেখা গেছে, ইহুদি ধর্মীয় উৎসবের দিনেই একাধিকবার হামলা হয়েছে, যাতে আতঙ্ক আরও গভীর হয়।
ঘটনার দিন অন্তত হাজার জন মানুষ সৈকতে হানুকা উদ্যাপনে উপস্থিত ছিলেন। মাত্র দশ মিনিটের গুলিবর্ষণেই বদলে যায় সবকিছু। এক আততায়ী পুলিশের গুলিতে নিহত হয়, অন্যজন গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে। পরে জানা যায়, এলাকায় বিস্ফোরকও পাতা ছিল, যা সময়মতো নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হয়।
এই হামলা শুধু অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর প্রশ্ন তুলছে না, বরং মনে করিয়ে দিচ্ছে—বিশ্ব রাজনীতির সংঘাত কত সহজেই নিরীহ মানুষের জীবনে রক্তক্ষয় ডেকে আনতে পারে। গাজ়ার যুদ্ধের আগুন যে সিডনির সৈকত পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে, তা হয়তো কেউ কল্পনাও করেনি। কিন্তু বন্ডির রক্তাক্ত বালু আজ সেই কঠিন বাস্তবতারই সাক্ষ্য।