ইজ়রায়েলে বসবে ছত্রপতি শিবাজির মূর্তি!
ইজ়রায়েলের মাটিতে ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের একটি বিশালাকার মূর্তি স্থাপনের ঘোষণা ঘিরে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে ভারত ও ইহুদি সম্প্রদায়ের বহু শতাব্দী পুরনো সম্পর্ক। মুম্বইয়ে ইজ়রায়েলের কনস্যুলেট জেনারেলের এই ঘোষণার পর শুধু কূটনৈতিক মহলই নয়, ইতিহাসপ্রেমীদের মধ্যেও শুরু হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। কারণ, এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মরাঠা সাম্রাজ্য এবং ‘বেনে ইজ়রায়েল’ নামে পরিচিত ভারতীয় ইহুদি সম্প্রদায়ের এক অনন্য ইতিহাস।
ঘোষণার দিনটি ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৬৭৪ সালের ৬ জুন রায়গড় দুর্গে শিবাজির রাজ্যাভিষেক হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক দিনের ৩৫০ বছর পূর্তির প্রেক্ষাপটে ইজ়রায়েলের এই ঘোষণা নিঃসন্দেহে প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীসও এই উদ্যোগকে ভারত-ইজ়রায়েল সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলে উল্লেখ করেছেন।
ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, বিশ্বের নানা দেশে নিপীড়নের শিকার হলেও ভারতবর্ষে ইহুদিরা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছিলেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাঁরা এখানে নিজেদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় বজায় রেখে বসবাস করেছেন। এই সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কই পরবর্তীকালে ভারত ও ইজ়রায়েলের কূটনৈতিক বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
পশ্চিম ভারতের কোঙ্কন উপকূলে বসবাসকারী ‘বেনে ইজ়রায়েল’ সম্প্রদায়কে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ইহুদি গোষ্ঠী বলে মনে করা হয়। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, বহু শতাব্দী আগে পশ্চিম এশিয়া থেকে আগত কিছু ইহুদি কোঙ্কন উপকূলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সময়ের সঙ্গে তাঁরা স্থানীয় ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে যান। মরাঠি ভাষা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
শিবাজির উত্থানের সময় থেকেই এই সম্প্রদায়ের বহু সদস্য মরাঠা সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, শিবাজিই প্রথম তাঁদের সামরিক দক্ষতার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন। মোগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ‘স্বরাজ্য’ গঠনের লড়াইয়ে এই ইহুদি যোদ্ধারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
বিশেষ করে মরাঠা নৌবাহিনীতে তাঁদের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথিতে অ্যারন চুরিকার, স্যামুয়েল এবং আব্রাহামের মতো ইহুদি সেনানায়কদের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁদের নেতৃত্ব ও যুদ্ধকৌশলে মুগ্ধ হয়ে শিবাজি বিশেষ সম্মান ও দায়িত্ব দিয়েছিলেন বলেও দাবি করা হয়। মরাঠা সাম্রাজ্যের সামুদ্রিক শক্তি বৃদ্ধির পিছনে এই সম্প্রদায়ের অবদান কম ছিল না।
পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ আমলেও ‘বেনে ইজ়রায়েল’ সম্প্রদায়ের বহু সদস্য সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাহিনী থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামরিক অভিযানে তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণের উল্লেখ পাওয়া যায়। উচ্চ শিক্ষার হার এবং প্রশাসনিক দক্ষতার জন্যও তাঁরা পরিচিত ছিলেন।
১৯৪৮ সালে আধুনিক ইজ়রায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এই সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ ভারতে বসবাস ছেড়ে ইজ়রায়েলে চলে যায়। বর্তমানে সেখানে তাঁদের সংখ্যা কয়েক দশ হাজারে পৌঁছেছে। তবুও ভারতীয় সংস্কৃতি, বিশেষ করে মরাঠি ভাষা ও খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক আজও অটুট।
এই প্রেক্ষাপটে শিবাজির মূর্তি স্থাপনের সিদ্ধান্তকে অনেকেই শুধুমাত্র একটি সাংস্কৃতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন না। বরং এটি দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং দীর্ঘদিনের মানবিক সম্পর্কের প্রতীক বলেই মনে করা হচ্ছে।
ইজ়রায়েলের কূটনীতিকদের বক্তব্য, এই মূর্তি শুধু একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে সম্মান জানানোর প্রকল্প নয়; বরং ভারত ও ইজ়রায়েলের জনগণের মধ্যে সম্পর্ককে আরও গভীর করার একটি প্রচেষ্টা। কোন শহরে মূর্তিটি স্থাপন করা হবে, তা এখনও চূড়ান্ত না হলেও, এই ঘোষণা ইতিমধ্যেই ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়কে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এনে দিয়েছে।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?