আগুনের পরেই তৎপরতা, কিছু দিন পর ফের আগের ছবিই!
নিউ মার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেলে সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড ফের সামনে এনে দিয়েছে কলকাতার অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে পুরনো প্রশ্ন। গত দু’দশকে শহর একের পর এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সাক্ষী হয়েছে। কখনও হোটেল, কখনও কারখানা, কখনও হাসপাতাল কিংবা সরকারি ভবন—আগুনের পর তদন্ত, গ্রেফতার, নির্দেশিকা এবং প্রশাসনিক তৎপরতা দেখা গেলেও কয়েক বছর পর ফের একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে।
রাজ্যে এই সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক পালাবদলও হয়েছে। বাম আমল থেকে তৃণমূল, বর্তমানে বিজেপি সরকারের সময়েও কলকাতার অগ্নিকাণ্ডের চিত্রে যেন খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি, বেরোনোর পথ বন্ধ থাকা, তালাবন্ধ ফায়ার এগজ়িট কিংবা দাহ্য পদার্থের মজুত—বিভিন্ন ঘটনায় বার বার এমন অভিযোগ উঠেছে।
তপসিয়া, ২০০৬: একটি দরজাই হয়ে উঠেছিল বিপদ
২০০৬ সালের ২২ নভেম্বর তপসিয়ার একটি চামড়ার কারখানায় আগুন লাগে। প্রায় ৪০ জন শ্রমিক তখন ভিতরে কাজ করছিলেন। আগুন লাগার পর বেরোনোর জন্য একমাত্র দরজাটি ব্যবহার করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন তাঁরা। অভিযোগ ওঠে, দরজার চাবি পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত তালা ভেঙে বেরোতে হলেও ৯ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। আহত হন ১৮ জন।
স্টিফেন কোর্ট, ২০১০: সিঁড়িতেই আটকে মৃত্যু
২০১০ সালের ২৩ মার্চ পার্ক স্ট্রিটের স্টিফেন কোর্টে ভয়াবহ আগুন কলকাতাকে স্তম্ভিত করে। আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে বহু মানুষ আটকে পড়েন। কেউ জানলা দিয়ে বেরোনোর চেষ্টা করেন, কেউ প্রাণ বাঁচাতে নীচে ঝাঁপ দেন। শেষ পর্যন্ত ৪৩ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন কয়েকশো মানুষ।
আমরি হাসপাতাল, ২০১১: বিষাক্ত ধোঁয়ায় মৃত্যু ৯৩ জনের
২০১১ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকুরিয়ার আমরি হাসপাতালে আগুন লাগে। হাসপাতালের বেসমেন্টে থাকা দাহ্য সামগ্রী থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে জানা যায়। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বিষাক্ত ধোঁয়া। বিশেষ করে আইসিইউ এবং গুরুতর অসুস্থ রোগীদের উদ্ধার করা কঠিন হয়ে ওঠে। সেই ঘটনায় ৯৩ জনের মৃত্যু হয়।
শিয়ালদহ, ২০১৩: ঘুমন্ত শ্রমিকদের আর বেরোনোর সুযোগ হয়নি
২০১৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ভোরে সূর্য সেন স্ট্রিটের কাগজ ও প্লাস্টিকের বাজারে আগুন লাগে। বাজারের ভিতরে তখন বহু শ্রমিক ঘুমিয়ে ছিলেন। আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকে বেরোতে পারেননি। মৃত্যু হয় ২০ জনের।
স্ট্র্যান্ড রোড, ২০২১: দমকলকর্মীরাও রেহাই পাননি
২০২১ সালের ৯ মার্চ সন্ধ্যায় স্ট্র্যান্ড রোডের পূর্ব রেলের নিউ কয়লাঘাট বিল্ডিংয়ে আগুন লাগে। ঘটনায় ৯ জনের মৃত্যু হয়। মৃতদের মধ্যে ছিলেন রেলের আধিকারিক, দমকলকর্মী, পুলিশ এবং আরপিএফের সদস্যরা। কয়েক জনের মৃত্যু হয় ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে।
মেছুয়াবাজার, ২০২৫: হোটেলে আগুনে মৃত্যু ১৪ জনের
২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল মেছুয়াবাজারের একটি হোটেলে অগ্নিকাণ্ড ফের হোটেলগুলির অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেয়। ঘটনায় দুই শিশুসহ ১৪ জনের মৃত্যু হয় এবং ১৩ জন আহত হন। হোটেলগুলির রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু হয়।
আনন্দপুর, ২০২৬: গুদামের আগুনে নিখোঁজ বহু শ্রমিক
২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি সাধারণতন্ত্র দিবসের ভোরে আনন্দপুরের নাজিরাবাদ এলাকায় একটি মোমো কারখানার গুদামে আগুন লাগে। আগুন দ্রুত পাশের গুদামেও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে বিভিন্ন জেলার শ্রমিকেরা ছিলেন। প্রায় ৭২ ঘণ্টা তল্লাশির পরে ১৮টি দেহাংশ শনাক্ত করা যায়। মোট ২৭ জনের নামে নিখোঁজ ডায়েরি হয়েছিল।
নিউ মার্কেট, ২০২৬: ফের সেই পুরনো প্রশ্ন
১৯ অগস্ট ২০২৬-এর নিউ মার্কেটের হোটেল অগ্নিকাণ্ডে ফের প্রশ্ন উঠেছে হোটেলগুলির অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে। কী ধরনের ব্যবস্থা ছিল, আবাসিকদের দ্রুত বের করে আনার ক্ষেত্রে সমস্যা কেন হল—এসব খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু হয়েছে।
প্রতিটি বড় অগ্নিকাণ্ডের পর প্রশাসনের তৎপরতা দেখা যায়। তৈরি হয় তদন্ত কমিটি, জারি হয় নতুন নির্দেশিকা, কোথাও গ্রেফতারও হয়। কিন্তু সময় গড়ালে সেই তৎপরতা কতটা স্থায়ী হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
কলকাতার অগ্নিকাণ্ডের ইতিহাস তাই শুধু আগুনে পুড়ে যাওয়া ভবনের গল্প নয়—এটি অগ্নিনিরাপত্তার নিয়ম কতটা কার্যকর ভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেই প্রশ্নও বার বার সামনে আনে।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?।