দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য ‘পথের পাঁচালী’ এখন শ্রাব্য!
একটি কালজয়ী চলচ্চিত্র, যেখানে প্রতিটি দৃশ্য যেন কথা বলে। কিন্তু যদি কেউ সেই দৃশ্য দেখতেই না পান? সিনেমার জগৎ কি তবে তার কাছে অধরাই থেকে যাবে? না, আর নয়! এবার সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরাও অনুভব করতে পারবেন শ্রবণের মাধ্যমে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আর্য মৈত্র এই অসাধারণ উদ্যোগ নিয়েছেন, যেখানে ছবিটির প্রতিটি মুহূর্তকে শব্দের ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে।
আগামী শুক্রবার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবেকানন্দ হলে ‘পথের পাঁচালী— এক অন্য দেখা’ শীর্ষক বিশেষ প্রদর্শনী হবে, যেখানে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা শ্রাব্য বিবরণীর মাধ্যমে এই চলচ্চিত্র অনুভব করতে পারবেন। এটি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিতে চলেছে।
কীভাবে এলো এই উদ্যোগ?
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের স্নাতকোত্তরের ছাত্র আর্য মৈত্র জানালেন, তার কোর্সের একটি বিশেষ পাঠ্য ছিল ‘ডিজঅ্যাবিলিটি ইন ইন্ডিয়ান লিটারেচার’। এই কোর্সেই বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের বিনোদনের অধিকার নিয়ে আলোচনা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ঈশান চক্রবর্তী, যিনি নিজেও দৃষ্টিহীন, দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। তার অনুপ্রেরণাতেই আর্য এই উদ্যোগ নেন। আর্য বলেন, “বিশেষভাবে সক্ষমদের জন্য সংরক্ষণ, ভাতা বা অন্যান্য সুবিধার কথা বলা হয়। কিন্তু বিনোদনের অধিকার নিয়ে কেউ কথা বলে না। সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা তাদের কাছেও সমানভাবে আনন্দদায়ক হওয়া উচিত।”
এই চিন্তা থেকেই তিনি শুরু করেন ‘অডিও ডেসক্রিপশন’ বা শ্রাব্য বিবরণী তৈরি করার কাজ।
কীভাবে কাজ করেছেন আর্য?
একটি সিনেমা শুধুমাত্র সংলাপেই তৈরি হয় না, তার আবেগ, দৃশ্যপট, চরিত্রের অভিব্যক্তিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই আর্য চেষ্টা করেছেন, যেন সংলাপের ব্যাঘাত না ঘটিয়ে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যের বিবরণ দিতে পারেন।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, “যেখানে চরিত্রের অভিব্যক্তি বা দৃশ্যের পরিবর্তন গল্প বলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সেখানেই আমি শ্রাব্য বর্ণনা দিয়েছি। কিন্তু যেখানে সংলাপই যথেষ্ট, সেখানে বাড়তি কিছু বলিনি।”
উদাহরণ হিসেবে তিনি ‘পথের পাঁচালী’র একটি বিশেষ দৃশ্যের কথা বলেন:
👉 সর্বজয়া অপুকে খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন, কিন্তু অপু ব্যস্ত তির-ধনুক নিয়ে খেলায়।
👉 সর্বজয়া বিরক্ত হয়ে ভাত মাটিতে ফেলে দেন।
👉 সেই ভাত কুকুর খেতে শুরু করে, আর শেষটুকু পড়ে যায় কুকুরের মাথায়!
এমন ছোট ছোট মুহূর্তগুলোকেই শব্দের মাধ্যমে জীবন্ত করে তুলেছেন আর্য। তবে যাত্রাপালার দৃশ্যের মতো কিছু অংশে তিনি কোনো বিবরণ দেননি, কারণ শুধুমাত্র সংলাপই যথেষ্ট ছিল।
বাংলায় প্রথম শ্রাব্য বিবরণী সহ সিনেমা!
‘পথের পাঁচালী— এক অন্য দেখা’ শুধুমাত্র একটি প্রদর্শনী নয়, এটি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত। কারণ বাংলা ভাষায় কোনো সিনেমার এমন শ্রাব্য বিবরণী আগে কখনও তৈরি হয়নি।
এই আয়োজন করেছে সেন্টার ফর পার্সনস উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিজ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। ঈশান চক্রবর্তী জানান, কিছুদিন আগেই তারই ক্লাসের দুই ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রেল মানচিত্র তৈরি করেছেন, যা দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের ক্যাম্পাসে চলাফেরায় সাহায্য করবে।
এই উদ্যোগ শুধু ‘পথের পাঁচালী’ নয়, ভবিষ্যতে অন্যান্য বাংলা সিনেমার ক্ষেত্রেও এমন উদ্যোগ নেওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করল।
শেষ কথা
সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা চোখ দিয়ে না দেখলেও, অনুভব করা যায় হৃদয় দিয়ে— সেটাই এবার প্রমাণিত হতে চলেছে।
শ্রাব্য বর্ণনায়, শব্দের গভীরতায় ‘পথের পাঁচালী’ এবার নতুনভাবে স্পর্শ করবে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের হৃদয়।
এটাই হয়তো সত্যিকারের সমাজের জন্য শিল্প— যেখানে কেউ বাদ পড়ে না! 🎥🎧✨
ট্রাম্পের ‘পাল্টা শুল্ক’ ঘোষণার অপেক্ষায় বিশ্ব, ভারতের চিন্তা বাড়ছে!