দুর্গাপুজোয় উৎসব নয়, শোকের আবহ! পশ্চিমবঙ্গের যে গ্রামগুলিতে মহিষাসুরই আরাধ্য দেবতা

দুর্গাপুজোয় উৎসব নয়, শোকের আবহ!! শহরজুড়ে যখন ঢাকের বাদ্যি, আলোর রোশনাই আর নতুন পোশাকে দুর্গোৎসবের আনন্দ, তখন পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি আদিবাসী গ্রামে ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা। কোথাও ঘরের দরজা-জানলা বন্ধ থাকে, কোথাও…

October 11, 2026
1 min read

দুর্গাপুজোয় উৎসব নয়, শোকের আবহ!!

শহরজুড়ে যখন ঢাকের বাদ্যি, আলোর রোশনাই আর নতুন পোশাকে দুর্গোৎসবের আনন্দ, তখন পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি আদিবাসী গ্রামে ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা। কোথাও ঘরের দরজা-জানলা বন্ধ থাকে, কোথাও কালো কাপড়ে ঢাকা হয় বাড়ির চারপাশ। দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে উৎসবে যোগ দেওয়ার বদলে তাঁরা স্মরণ করেন নিজেদের পূর্বপুরুষকে। তাঁদের বিশ্বাস, মহিষাসুর কোনও দানব নন, তিনি এক বীর রাজা। তাই দেবী দুর্গার আরাধনার সময় তাঁদের কাছে শোকের দিন।

মহিষাসুর নন খলনায়ক, তাঁদের কাছে তিনি হুদুড় দুর্গা

বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং উত্তরবঙ্গের কয়েকটি এলাকায় বসবাস করেন অসুর জনজাতির মানুষ। তাঁদের লোকবিশ্বাসে মহিষাসুরের পরিচয় হুদুড় দুর্গা বা ঘোরাসুর নামে এক অনার্য বীর হিসেবে। প্রচলিত হিন্দু পুরাণে যাঁকে দেবী দুর্গার হাতে নিহত অসুর হিসেবে বর্ণনা করা হয়, অসুর সম্প্রদায়ের একাংশ তাঁকেই নিজেদের আদিপুরুষ ও আরাধ্য বলে মনে করেন।

তাঁদের বিশ্বাস, এক আর্য নারীর কৌশলে হুদুড় দুর্গাকে হত্যা করা হয়েছিল। এর পর তাঁদের পূর্বপুরুষেরা নিজেদের ভূমি ও ক্ষমতা হারান। এই কাহিনি তাঁদের কাছে শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, পূর্বপুরুষের স্মৃতি এবং নিজস্ব পরিচয়ের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে।

লোককথা অনুযায়ী, পরাজয়ের পর নিজেদের রক্ষা করতে সাঁওতাল, মুণ্ডা, কোল, কুড়মি, মাহালি ও কোড়া-সহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষ অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছিলেন। এই উপাখ্যানের নানা রূপ বিভিন্ন আদিবাসী সমাজে প্রচলিত রয়েছে।

দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে ঘরবন্দি থাকেন কেউ কেউ

আলিপুরদুয়ারের মাঝেরডাবরি চা-বাগান ও সংলগ্ন অসুর জনবসতিতে দুর্গাপুজোর সময় অনেক পরিবার নিজেদের ঘরেই থাকেন। বাইরে থেকে ঢাক ও কাঁসরের আওয়াজ ভেসে এলে দরজা বন্ধ করে দেন কেউ কেউ। আবার কোনও কোনও বাড়িতে কালো কাপড়ও ঝোলানো হয়। পুজো শেষ হলে নদীতে স্নান করে তাঁরা স্বাভাবিক কাজে ফিরে যান।

ডুয়ার্সের ক্যারন চা-বাগান এবং মালবাজারের আশপাশেও অসুর সম্প্রদায়ের কয়েকটি পরিবারের বাস। তাঁদের অনেকেই নিজেদের মহিষাসুরের বংশধর বলে পরিচয় দেন। কেউ চা-বাগানে কাজ করেন, কেউ দিনমজুরি করেন, আবার কেউ লোহার কাজের সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের নিজস্ব ভাষা আসুরি এবং সারনা পুজো, নাওয়াখানি, গোহালি পুজোর মতো নানা আচারও রয়েছে।

জলপাইগুড়ির ঝোবিপাট ও চারুয়াপাটের মতো কিছু জনবসতিতেও মহিষাসুরকে স্মরণ করার রীতি রয়েছে। তাঁদের কাছে তিনি মহিষরূপী কোনও দানব নন, বরং গোঁফওয়ালা, হাতে অস্ত্রধারী এক রাজা। সেই কারণেই দুর্গোৎসবের দিনগুলি তাঁদের একাংশের কাছে শোক পালনের সময়।

শোকের মধ্যেও রয়েছে নিজস্ব উৎসব

পুরুলিয়ার কাশীপুরের কিছু আদিবাসী সংগঠনের সদস্যেরা এখনও হুদুড় দুর্গাকে স্মরণ করার রীতি বজায় রেখেছেন। দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে স্মৃতিচারণের পাশাপাশি কাঠি নাচ, করম নাচ, কবিগান ও ছৌ নাচের আয়োজন করা হয়। কোথাও পুরুষেরা নারীর পোশাক পরে ‘দাঁশাই’ নাচের মাধ্যমে শোক প্রকাশ করেন। হাতে থাকে ‘ভুয়াং’ নামে পরিচিত বাদ্যযন্ত্র। বুক চাপড়ে বিলাপ করতে করতে নাচের এই ধারাকে অনেকে ‘দুঃখ-দাঁশাই’ও বলেন।

ঝাড়খণ্ডের লোহারদাগা ও গুমলা অঞ্চলের কিছু অসুর জনবসতিতেও দুর্গাপুজোর সময় শোকগাথা পাঠ করা হয়। কোথাও মহিলারা সাদা শাড়ি পরেন। আবার দশেরায় রাবণ বধের রীতিও কিছু এলাকার মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁদের লোকবিশ্বাসে রাবণও আরাধ্য চরিত্র।

বদলাচ্ছে সময়, বদলাচ্ছে পরবর্তী প্রজন্মের ভাবনা

উত্তরবঙ্গের কিছু চা-বাগানে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দুর্গাপুজোর আয়োজন হচ্ছে, যেখানে অসুর সম্প্রদায়ের কয়েক জনও যুক্ত হয়েছেন বলে জানা যায়। নতুন প্রজন্মের কেউ কেউ পুরনো রীতির পাশাপাশি বৃহত্তর সামাজিক পরিসরে অংশ নেওয়ার পথ খুঁজছেন। আবার অনেক পরিবার পূর্বপুরুষের বিশ্বাস ও আচারও ধরে রেখেছেন।

মহিষাসুরকে ঘিরে এই কাহিনিগুলির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে নানা মত থাকলেও, আদিবাসী সমাজের কাছে এগুলি তাঁদের নিজস্ব স্মৃতি, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দুর্গাপুজোর প্রচলিত কাহিনির পাশাপাশি এই ভিন্ন বিশ্বাসও মনে করিয়ে দেয়, একই উৎসবকে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী কত আলাদা দৃষ্টিতে দেখতে পারে।

রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?।

Follow us on Google News Get real-time updates & exclusive sports coverage
Follow

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *