১ লক্ষ ৭৬ হাজার বছর আগে গুহার অন্ধকারে পাথরের বৃত্ত!
আজ থেকে প্রায় ১ লক্ষ ৭৬ হাজার বছর আগে। ইউরোপের এক গভীর গুহার অন্ধকারে মানুষের মতোই বুদ্ধিমান কোনও প্রাণী টন টন পাথর কেটে, সরিয়ে এনে নির্দিষ্ট নকশায় সাজিয়েছিল। শুধু পাথর রাখা নয়, সেগুলিকে বৃত্তাকার কাঠামোর মতো করে তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু কেন? সেখানে কি কোনও বিশেষ কাজ হত, নাকি কোনও আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিল এই নির্মাণ? এত বছর পরেও নিশ্চিত উত্তর খুঁজে পাননি বিজ্ঞানীরা।
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমে টার্ন-এ-গারোন প্রদেশের অ্যাভিয়েরন গিরিখাতের ব্রুনিকেল গুহায় রয়েছে এই আশ্চর্য নিদর্শন। ১৯৯০ সালে এক দল অভিযাত্রী গুহাটি খুঁজে পান। নুড়িপাথরের ঢাল সরিয়ে গুহার প্রবেশপথের সন্ধান মেলে। সেখান থেকে প্রায় ৩৩৬ মিটার ভিতরে গিয়ে তাঁরা এমন কিছু দেখতে পান, যার ব্যাখ্যা নিয়ে আজও গবেষণা চলছে।
গুহার সেই অংশে দিনের আলো পৌঁছনোর কোনও সুযোগ নেই। অথচ মেঝের উপর ছড়িয়ে থাকা স্ট্যালাগমাইটের টুকরো দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল ছ’টি কাঠামো। তার মধ্যে দু’টি ছিল বৃত্তাকার—একটি বড়, অন্যটি ছোট। বাকি চারটি কাঠামোর দু’টি বড় বৃত্তের ভিতরে এবং দু’টি বাইরে ছিল।
ফ্রান্সের জাতীয় গবেষণা সংস্থা সিএনআরএস-এর হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৪০০টি স্ট্যালাগমাইটের টুকরো দিয়ে এই কাঠামোগুলি তৈরি করা হয়েছিল। প্রায় ১১২ মিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা পাথরগুলির মোট ওজন ছিল প্রায় ২.২ টন। এগুলি যে স্বাভাবিক ভাবে ভেঙে পড়ে এমন অবস্থান তৈরি হয়নি, তার যথেষ্ট প্রমাণও রয়েছে। বড় পাথরের ফাঁকে ছোট টুকরো ঢুকিয়ে কাঠামো শক্ত করা হয়েছিল। কিছু পাথর আবার বাইরে থেকে ঠেকনার মতো করে দাঁড় করানো ছিল।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলির একটি ছিল আগুনের চিহ্ন। কাঠামোগুলির মধ্যে পোড়া হাড়ের টুকরো পাওয়া যায়। কয়েকটি স্ট্যালাগমাইটেও লালচে বা কালচে দাগ ছিল। পরবর্তী গবেষণায় রমন স্পেকট্রোমেট্রি ব্যবহার করে দেখা যায়, পোড়া হাড়গুলি নিয়ন্ত্রিত ভাবে আগুনে পোড়ানোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে গবেষকদের ধারণা, গুহার ভিতরে ইচ্ছাকৃত ভাবেই আগুন জ্বালানো হয়েছিল।
২০১৩ সালে বর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যাক জবারের নেতৃত্বে গবেষকরা পাথরগুলির বয়স নির্ধারণ করেন। ২০১৬ সালে ‘নেচার’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় জানা যায়, কাঠামোগুলির বয়স প্রায় ১ লক্ষ ৭৬ হাজার ৫০০ বছর। এই সময় ইউরোপে আধুনিক মানুষ, অর্থাৎ হোমো সেপিয়েন্সের উপস্থিতির প্রমাণ ছিল না। তাই গবেষকদের অনুমান, এগুলি নিয়ানডারথালদের তৈরি।
আরও একটি রহস্য রয়েছে গুহার প্রবেশপথ নিয়ে। ১৯৯০ সালে অভিযাত্রীরা যে সংকীর্ণ পথ দিয়ে গিয়েছিলেন, সেটি আদিমানবদের ব্যবহারের উপযোগী ছিল না। পরবর্তী গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে, গুহার মূল প্রবেশপথটি এক সময় দুই মিটারেরও কম উঁচু ছিল। প্রায় ১ লক্ষ ৪২ হাজার ৯০০ বছর আগে ভূমিধসের কারণে সেই পথ বন্ধ হয়ে যায়। তার ফলে গুহার ভিতরের কাঠামোগুলিও দীর্ঘ সময় প্রায় অক্ষত অবস্থায় থেকে যায় বলে ধারণা গবেষকদের।
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখনও একই—নিয়ানডারথালরা কেন এত পরিশ্রম করে গুহার এত গভীরে গিয়ে ২.২ টন পাথর সাজিয়েছিল?
কেউ মনে করেন, শীতের সময়ে গুহাটি আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। আবার কারও মতে, এই কাঠামোর সঙ্গে কোনও আচার বা প্রতীকী কর্মকাণ্ডের যোগ থাকতে পারে। কিন্তু গুহায় বসবাসের স্পষ্ট প্রমাণ, পাথরের সরঞ্জাম, কিংবা নিয়ানডারথালদের হাড় পাওয়া যায়নি। তাই কোনও একটি ব্যাখ্যাকে এখনও নিশ্চিত বলে মানার সুযোগ নেই।
প্রায় ১ লক্ষ ৭৬ হাজার বছর আগের সেই পাথরের বৃত্ত আজও বিজ্ঞানীদের সামনে এক অমীমাংসিত প্রশ্ন হয়ে রয়েছে—অন্ধকার গুহার গভীরে গিয়ে ঠিক কী করতে চেয়েছিল নিয়ানডারথালরা?
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?।