জলের বদলে ঘি দিয়ে তৈরি মন্দির!!
ভারতের ইতিহাস ও স্থাপত্যের ভান্ডারে এমন বহু নিদর্শন রয়েছে, যেগুলি শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, তাদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লোককথার কারণেও বিস্ময় তৈরি করে। রাজস্থানের বিকানেরের ভান্দাসর জৈন মন্দির তেমনই এক স্থাপত্য। প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছরের পুরনো এই মন্দিরকে ঘিরে সবচেয়ে চমকপ্রদ দাবি— নির্মাণের সময় নাকি জলের বদলে ব্যবহার করা হয়েছিল ঘি!
বিকানেরের মতো মরুপ্রধান এলাকায় জলের অভাব নতুন কিছু নয়। স্থানীয় প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, এই জলসঙ্কটের সময়েই ধনী জৈন বণিক ভান্দাসা অসওয়াল ১৪৬৮ সালে মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু করেন। মন্দিরটি উৎসর্গ করা হয় জৈন ধর্মের পঞ্চম তীর্থঙ্কর সুমতিনাথকে। তিনিই এই মন্দিরের প্রধান আরাধ্য।
মন্দিরের নির্মাণকে ঘিরে রয়েছে আরও একটি চমকপ্রদ গল্প। কথিত আছে, নির্মাণকাজে জল ব্যবহার না করে ঘি ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ভান্দাসা। স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, তিনি ধীরে ধীরে ঘি জমাতে শুরু করেন। প্রথম দিকে তাঁর এই আচরণ দেখে অনেকে তাঁকে কৃপণ বলেও ঠাট্টা করতেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিপুল পরিমাণ ঘি সংগ্রহ করে তা মন্দির নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়।
প্রচলিত কাহিনিতে এমনও বলা হয়, মন্দির তৈরিতে প্রায় ৪০ হাজার কেজি ঘি ব্যবহার হয়েছিল। চুন-সুড়কির সঙ্গে খাঁটি ঘি মেশানো হয়েছিল বলেও স্থানীয়দের দাবি। তবে এই দাবির কোনও সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। শুধুমাত্র ঘি ব্যবহার করে কী ভাবে নির্মাণের কাজে জলের বিকল্প তৈরি করা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। ফলে ‘ঘিয়ের মন্দির’-এর গল্পকে ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত তথ্যের পাশাপাশি স্থানীয় লোকবিশ্বাস হিসাবেও দেখা হয়।
মন্দিরটির নির্মাণ অবশ্য অল্প সময়ে শেষ হয়নি। ১৪৬৮ সালে কাজ শুরু হলেও ভান্দাসা অসওয়াল ১৫১৪ সালে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পরও নির্মাণকাজ চলতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত ১৫৫৪ সালে মন্দিরটি সম্পূর্ণ হয়। অর্থাৎ পুরো নির্মাণে সময় লাগে প্রায় ৮৪ বছর।
স্থাপত্যের দিক থেকেও ভান্দাসর জৈন মন্দির যথেষ্ট আকর্ষণীয়। তিনতলা এই মন্দিরে লাল বেলেপাথর ও শ্বেতপাথরের ব্যবহার দেখা যায়। দেওয়ালজুড়ে সূক্ষ্ম কারুকাজের পাশাপাশি রয়েছে রঙিন লোকচিত্র ও কাচের শিল্পকর্ম। জৈন ধর্মের ২৪ জন তীর্থঙ্করের কাহিনিও মন্দিরের বিভিন্ন অংশে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
মন্দিরটি বর্তমানে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ বা এএসআইয়ের তত্ত্বাবধানে রয়েছে বলে জানা যায়। মন্দিরের উঁচু অংশ থেকে বিকানের শহরের বিস্তৃত দৃশ্যও দেখা যায়।
এই মন্দিরকে ঘিরে আরও একটি স্থানীয় বিশ্বাস রয়েছে। প্রচণ্ড গরমে, বিশেষ করে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ালে মন্দিরের কিছু অংশ থেকে ঘি বা মাখনের মতো পদার্থ বেরিয়ে আসে বলে দাবি করেন স্থানীয়রা। তবে এই দাবিরও নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
ইতিহাস, স্থাপত্য এবং লোককথা— তিনের মেলবন্ধনেই তাই আজও আকর্ষণের কেন্দ্র বিকানেরের ভান্দাসর জৈন মন্দির। ‘ঘি দিয়ে তৈরি মন্দির’-এর গল্প সত্যিই কতটা বাস্তব, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও কয়েক শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপত্য ভারতের ঐতিহ্যের এক বিস্ময়কর নিদর্শন হয়ে রয়েছে।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?।