হোটেলে কড়া নজরদারি, সরকারি হাসপাতালের রান্নাঘরে বেহাল ছবি!
খাদ্যের গুণমান ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে কলকাতা জুড়ে যখন কড়া নজরদারি চলছে, তখন সরকারি হাসপাতালের রান্নাঘরের ছবিই তুলছে অন্য প্রশ্ন। হোটেল-রেস্তরাঁয় সামান্য অনিয়ম ধরা পড়লেই পুরসভার তরফে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কোথাও রান্নাঘর বন্ধ, কোথাও আবার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমস্যা মেটানোর নির্দেশ। কিন্তু যে রান্নাঘরে প্রতিদিন হাজার হাজার রোগীর জন্য খাবার তৈরি হয়, সেখানে নিয়ম মানার ছবিটা কেমন?
আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের রান্নাঘরের পরিস্থিতি নিয়ে উঠেছে এমনই অভিযোগ। প্রশাসনিক ভবনের কাছেই থাকা এই রান্নাঘরে প্রতিদিন প্রায় দু’হাজার রোগীর খাবার তৈরি হয়। অভিযোগ, রান্নাঘরের ভিতরের কলেই রান্নার সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা স্নান করেন। কাছেই দড়িতে শুকোয় জামাকাপড়। তেল-ময়লা জমে থাকা র্যাকে মুখ খোলা অবস্থায় রয়েছে গুঁড়ো মশলার প্যাকেট। রান্নাঘরে ঢোকার পথেও পড়ে রয়েছে বাসনপত্র ও আলুর বস্তা।
শুধু তাই নয়, ওয়ার্ডে রোগীদের খাবার পৌঁছে দেওয়া ট্রলিও রান্নাঘরের ভিতরে ঢুকছে বলে অভিযোগ। অন্য দিকে, রান্নাঘরের পাশের সরু জায়গায় নির্মাণকাজ চলায় উড়ছে সিমেন্ট-বালির ধুলো। ফলে খাবার তৈরির পরিবেশ নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে।
শহরের আরও একটি বড় সরকারি হাসপাতাল এনআরএস মেডিক্যাল কলেজের রান্নাঘরেও দেখা গিয়েছে বেশ কিছু অনিয়মের ছবি। সেখানে সাতটি গ্যাসস্টোভে আলাদা আলাদা করে ভাত, ডাল, সব্জি, মাছ, মাংস ও চা তৈরি হয়। কিন্তু একটি স্টোভের পাশেই রয়েছে নিকাশিনালা। অভিযোগ, সেখানে আবর্জনা জমে কার্যত খোলা ড্রেনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রান্নাঘরের মেঝেতেও তেলচিটে ময়লা জমে থাকতে দেখা গিয়েছে।
রুটি তৈরির জন্য আটা মাখছিলেন এক কর্মী। তাঁর মাথায় ক্যাপ বা গায়ে নির্দিষ্ট পোশাক ছিল না বলে অভিযোগ। রান্নাঘরে খোলা অবস্থায় পড়ে ছিল গুঁড়ো হলুদও। অথচ সম্প্রতি শহরের রেস্তরাঁগুলিতে মশলার প্যাকেটে মেয়াদ সংক্রান্ত তথ্য না থাকলেও পুরসভার আধিকারিকেরা প্রশ্ন তুলেছেন।
এনআরএসের রান্নাঘরের ম্যানেজার প্রসেনজিৎ ঘোষের দাবি, কলকাতা পুরসভা ও স্বাস্থ্য দফতরের কর্মীরা ইতিমধ্যেই রান্নাঘর পরিদর্শন করেছেন। আরজি করের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীর তরফেও একই দাবি করা হয়েছে। যদিও স্বাস্থ্য দফতরের রিপোর্টে ওই পরিদর্শনের উল্লেখ নেই বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তুলনায় ক্যালকাটা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের রান্নাঘরের পরিস্থিতি কিছুটা ভাল। সেখানে মেঝে তুলনামূলক পরিষ্কার এবং রান্নার বাসন ও মশলার পাত্রেও তেলচিটে কালো আস্তরণ দেখা যায়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সম্প্রতি রান্নার সামগ্রীর নমুনাও সংগ্রহ করা হয়েছে।
সরকারি হাসপাতালে রোগীদের খাবারের জন্য বরাদ্দও সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। ২০১৭ সালে যেখানে বরাদ্দ ছিল ৫৬ টাকা ৪০ পয়সা, গত বাজেটে তা বাড়িয়ে ১১০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। খাবারের মান যাচাই করতে বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শনও করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কাজলকৃষ্ণ বণিকের মতে, হাসপাতালে খাবার তৈরির ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতার মান আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন। রান্নার কর্মীদের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে শাকসব্জি, মাছ-মাংস, ডিম ও চাল সংরক্ষণ, রান্নার পাত্র জীবাণুমুক্ত রাখা এবং রোগীদের খাবার পরিবেশনের সময় স্বাস্থ্যবিধি— প্রতিটি ধাপেই নজর জরুরি। তাঁর কথায়, হাসপাতালের রোগীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক সময় কম থাকে। তাই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি খাবার তাঁদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আরজি করের এমএসভিপি সপ্তর্ষি চট্টোপাধ্যায়ের দাবি, রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে স্বাস্থ্য দফতরের নির্দেশ মেনে চলা হচ্ছে। তবে দীর্ঘ দিনের অভ্যাস বদলাতে কিছুটা সময় লাগছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
বেসরকারি খাবারের দোকানকে স্বাস্থ্যবিধি ঠিক করতে যখন নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া হচ্ছে, তখন সরকারি হাসপাতালের রান্নাঘরগুলির ক্ষেত্রেও কি একই রকম কড়া নজরদারি প্রয়োজন নয়? প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?।