ইনস্টাগ্রামের ব্যঙ্গ থেকে যন্তর মন্তরের জয়!
মাত্র আড়াই মাস আগে পর্যন্ত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) ছিল শুধুই একটি ইনস্টাগ্রাম পেজ। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, রাজনৈতিক কৌতুক আর তরুণদের হতাশার ভাষা ছিল তাদের পোস্টে। কিন্তু মাত্র ৭১ দিনের মধ্যেই সেই সোশ্যাল মিডিয়ার উদ্যোগ দেশের অন্যতম আলোচিত ছাত্র-আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠেছে। নিট প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলনের প্রথম বড় সাফল্য হিসেবে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে নিজেদের জয় বলেই দেখছে সিজেপি।
কী ভাবে শুরু ‘ককরোচ’-দের পথচলা?
২০২৬ সালের ১৫ মে দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এক মামলার শুনানিতে কিছু সমাজকর্মী ও বেকার যুবকদের ‘আরশোলা’ এবং ‘সমাজের পরজীবী’ বলে মন্তব্য করেন। সেই মন্তব্য ঘিরে দেশজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়। ঠিক পরদিন, ১৬ মে, জন্ম হয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র।
প্রথমদিকে এটি ছিল একটি ব্যঙ্গাত্মক ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট। শাসকদল, প্রশাসন এবং বিভিন্ন সামাজিক ইস্যু নিয়ে রসিকতার মোড়কে পোস্ট করত তারা। খুব অল্প সময়েই বিপুল সংখ্যক তরুণ এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হন। পরে নিট প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় ক্ষুব্ধ পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়িয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসে সিজেপি। সেখান থেকেই শুরু হয় যন্তর মন্তরের আন্দোলন।
কে এই অভিজিৎ দীপকে?
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে সাংবাদিকতা এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। একসময় আম আদমি পার্টির সমাজমাধ্যমের প্রচারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষারত। নিট প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে অংশ নিতেই জুন মাসে দেশে ফিরে আসেন তিনি।
প্রথম ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ফলোয়ার সংখ্যা দ্রুত ৯০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। পরে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ধারা ৬৯(এ)-এর আওতায় সেই অ্যাকাউন্ট ব্লক করা হয়। অভিযোগ ছিল, তাদের পোস্ট তরুণদের উস্কে দিতে পারে। তবে দিল্লি হাই কোর্টে আইনি লড়াইয়ের পর অ্যাকাউন্ট পুনরায় চালুর নির্দেশ আসে। এর মধ্যেই নতুন অ্যাকাউন্ট ‘Cockroach Is Back’ খুলে আন্দোলন চালিয়ে যায় সিজেপি।
আন্দোলনের মুখ কারা?
অভিজিৎ ছাড়াও আন্দোলনের প্রথম সারিতে উঠে আসেন সাংবাদিক সৌরভ দাস, সমাজকর্মী আশুতোষ রাঙ্কা, আফরিন নওয়াজ়, দীপক বলিয়ান, রত্না সিংহ-সহ একাধিক তরুণ মুখ।
সৌরভ দাস দীর্ঘদিন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করেছেন এবং তথ্যের অধিকার আইনের কর্মী হিসেবেও পরিচিত। অন্যদিকে, আইআইটি কানপুর ও লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্সের প্রাক্তনী আশুতোষ রাঙ্কা বিদেশের চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরে শিক্ষা ও পরিবেশ নিয়ে কাজ শুরু করেন। তাঁদের নেতৃত্বেই আন্দোলন দ্রুত জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে।
কী চায় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’?
সিজেপি নিজেদের পরিচয় দেয়— ‘তরুণদের, তরুণদের দ্বারা এবং তরুণদের জন্য’ একটি রাজনৈতিক ফ্রন্ট হিসেবে। তারা জানিয়েছে, প্রচলিত রাজনৈতিক দল হওয়ার কোনও ইচ্ছা তাদের নেই। বরং দুর্নীতি, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, স্বচ্ছ নিয়োগ এবং জবাবদিহিতার দাবিতেই তাদের আন্দোলন।
দলের ব্যঙ্গাত্মক ইস্তাহারও সমান আলোচনার বিষয়। সেখানে বলা হয়েছে, বিচারপতিদের অবসরের পরে রাজ্যসভার আসন দেওয়া হবে না, দলবদলকারী জনপ্রতিনিধিদের দীর্ঘ সময় নির্বাচনে লড়ার সুযোগ থাকবে না, মন্ত্রিসভায় ৫০ শতাংশ মহিলা প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হবে। এমনকি সদস্য হওয়ার শর্ত হিসেবে ‘বেকার’, ‘অলস’ এবং ‘প্রতিদিন অন্তত ১১ ঘণ্টা অনলাইনে থাকা’-র মতো ব্যঙ্গাত্মক শর্তও রাখা হয়েছে।
যন্তর মন্তরের আন্দোলন
নিট প্রশ্নফাঁসের পর লক্ষাধিক পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। সেই প্রেক্ষাপটে সিজেপি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, প্রশ্নফাঁসের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে।
লাদাখের সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকও অনশনে যোগ দেন। পরে দিল্লি পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, লাঠিচার্জ এবং কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের ঘটনাও আন্দোলনকে আরও বড় আকার দেয়। দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর কেন্দ্রের সঙ্গে একাধিক দফা বৈঠক হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও প্রশ্নফাঁস নিয়ে প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানান।
প্রথম বড় সাফল্য
অবশেষে শনিবার কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করলে যন্তর মন্তরে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন আন্দোলনকারীরা। চোখে জল নিয়ে অভিজিৎ দীপকে বলেন, “আমাদের ‘আরশোলা’ বলার জন্যই আজ এই আন্দোলনের জন্ম হয়েছে। সেই মন্তব্য না হলে হয়তো আমি দেশে ফিরতাম না, এই আন্দোলনও গড়ে উঠত না।”
তবে সিজেপির দাবি, এটি কেবল প্রথম জয়। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, পরীক্ষায় স্বচ্ছতা এবং বাকি দাবিগুলি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তারা। মাত্র ৭১ দিনের পথচলায় একটি ইনস্টাগ্রাম পেজ থেকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে পৌঁছে যাওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ এখন দেশের ছাত্র-আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত নাম।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?