বরফে ঢাকা পৃথিবী!
পৃথিবীর ইতিহাসে এমন সময়ও এসেছে, যখন আমাদের গ্রহটা ছিল একেবারে বরফের গোলা—‘স্নোবল আর্থ’। শুধু মেরু অঞ্চল নয়, নিরক্ষীয় অঞ্চলও ছিল বরফে মোড়া। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ৬০ কোটি বছর আগে পৃথিবী অন্তত দু’বার এমন ভয়াবহ তুষারযুগের মুখোমুখি হয়েছিল। তার মধ্যে একবার এই বরফাবৃত অবস্থা স্থায়ী ছিল প্রায় এক কোটি বছর! অন্য বার সেই সময়কাল ছিল মাত্র ৪০ লক্ষ বছর। কেন এই বিশাল তারতম্য? উত্তর খুঁজতে গিয়ে গবেষকেরা তাকাচ্ছেন সমুদ্রের দিকে।
ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ট্রেন্ট বি টমাস এবং তাঁর সহকর্মীরা প্রায় ৬০ কোটি বছরের পুরনো শিলার রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, পৃথিবীর তুষারযুগগুলির স্থায়িত্ব এক রকম ছিল না। তাঁদের ধারণা, এই পার্থক্যের নেপথ্যে রয়েছে সমুদ্রের জল ও শিলার মধ্যে ঘটে যাওয়া সূক্ষ্ম কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি রাসায়নিক বিক্রিয়া।
বিজ্ঞানীরা ‘স্নোবল আর্থ’ বলতে কী বোঝেন? যখন পুরো পৃথিবীই তুষারে ঢাকা থাকে—সমুদ্রের উপরিভাগ থেকে স্থলভাগ পর্যন্ত—তখন তাকে বরফের গোলা বলা হয়। এমন পরিস্থিতিতে ভূপৃষ্ঠের শিলার ভাঙন বা ক্ষয়প্রক্রিয়া অনেকটাই থেমে যায়, কারণ সবকিছু বরফে ঢাকা। কিন্তু সমুদ্রের নীচে পরিস্থিতি আলাদা।
সমুদ্রের তলদেশে ফাটল বা চির ধরলে, সেখান দিয়ে জল প্রবেশ করে এবং শিলার সঙ্গে বিক্রিয়া শুরু হয়। এই প্রক্রিয়ায় শিলা কার্বনকে খনিজ আকারে বন্দি করে ফেলে। ফলে পরিবেশে কার্বনের পরিমাণ কমতে থাকে, আর সমুদ্র হয়ে ওঠে যেন এক বিশাল কার্বন ভাণ্ডার। কার্বন-ডাই-অক্সাইড কমে গেলে বায়ুমণ্ডল আরও ঠান্ডা হয়। তাপমাত্রা কমলে বরফ গলতে পারে না—বরং আরও ছড়িয়ে পড়ে। টমাসের মতে, প্রথম দীর্ঘ তুষারযুগের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াই পৃথিবীকে লক্ষ লক্ষ বছর বরফে আটকে রেখেছিল।
তুষারযুগে নদীগুলিও বরফে জমে থাকায় তারা পলি বয়ে সমুদ্রে ফেলতে পারত না। ফলে সমুদ্রতলে নতুন স্তর তৈরি হত না। একই শিলাস্তর দীর্ঘদিন ধরে কার্বন-ডাই-অক্সাইডসমৃদ্ধ জলের সংস্পর্শে থাকত। এতে বিক্রিয়া চলতেই থাকত, আর কার্বন জমত সমুদ্রগর্ভে। পরিবেশে কার্বন কমতে কমতে শীতলতা স্থায়ী হয়ে উঠত।
আরও একটি সম্ভাব্য কারণের কথা বলছেন গবেষকেরা—সমুদ্রজলে সালফেটের স্বল্পতা। সালফেট কম থাকলে কিছু নির্দিষ্ট রাসায়নিক বিক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়, যা কার্বন শোষণের হার বাড়াতে পারে। ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন কমে গিয়ে শীতলতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
এতদিন পর্যন্ত সাধারণ ধারণা ছিল, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত থেকে নির্গত গ্যাস ও বায়ুমণ্ডলের কার্বনের ওঠানামাই তুষারযুগের শুরু ও শেষের মূল কারণ। কিন্তু টমাসের নেতৃত্বাধীন গবেষণা বলছে, সমুদ্রের গভীরে চলা নীরব রাসায়নিক বিক্রিয়াই হয়তো প্রথম দীর্ঘ তুষারযুগকে এতটা টেনে নিয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় তুষারযুগ তুলনায় কম স্থায়ী হওয়ার পিছনেও থাকতে পারে একই প্রক্রিয়ার ভিন্ন মাত্রা।
পৃথিবীর অতীতের এই বরফে ঢাকা অধ্যায় শুধু ইতিহাস নয়, ভবিষ্যতেরও ইঙ্গিত বহন করে। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে দাঁড়িয়ে, সমুদ্রের ভূমিকা যে কতটা গভীর ও জটিল—এই গবেষণা তারই আর এক স্মারক।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?