মরুর বুকে শীতের বিস্ময়!
প্রকৃতির খেয়াল কখনও কখনও এমন রূপ নেয়, যা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করাই কঠিন। আরবের তপ্ত মরুভূমি মানেই যেখানে অনাবৃষ্টি, প্রচণ্ড রোদ আর অসীম বালির রাজত্ব— সেই ঊষর ভূমিই হঠাৎ ঢেকে গেল পুরু তুষারের চাদরে। সৌদি আরবের একাধিক মরুপ্রান্তরে সাম্প্রতিক তুষারপাত গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। বাদামি বালির বদলে চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে শুভ্র সাদা বরফ, যেন প্রকৃতি নিজেই নিজের নিয়ম ভেঙে নতুন ছবি এঁকেছে।
সাধারণত আরব মরুভূমিতে সারা বছরই চরম আবহাওয়ার আধিপত্য থাকে। গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ছুঁয়ে ফেলে অসহনীয় মাত্রা, আর বৃষ্টিপাত প্রায় নেই বললেই চলে। শীতকালে কোথাও কোথাও সামান্য বৃষ্টি হলেও তা নিতান্তই অপ্রতুল। সেই কারণে মরুভূমিতে তুষারপাত হওয়া বিরলতম ঘটনা। কিন্তু চলতি সপ্তাহে উত্তর-পশ্চিম সৌদি আরবের তাবুক অঞ্চল এবং ট্রোজেনা পার্বত্য এলাকায় আবহাওয়ার হঠাৎ পরিবর্তনে দেখা মিলেছে ভারী তুষারপাতের।
রাস্তাঘাট, পাহাড়ি ঢাল, এমনকি মরুভূমির বালিয়াড়িও ঢেকে গিয়েছে সাদা আস্তরণে। মরুর ‘জাহাজ’ উটদের হাঁটতে দেখা গিয়েছে বরফে মোড়া পথে। গাড়ি, বাড়ির ছাদ, খোলা প্রান্তর— সব জায়গাতেই বরফ জমেছে পুরু স্তরে। ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে তুষারের কণা উড়ে এসে ঢুকেছে ঘরবাড়িতেও। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা নেমে গিয়েছে হিমাঙ্কের চার ডিগ্রি সেলসিয়াস নীচে, যা এই অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত অস্বাভাবিক।
এই দৃশ্যের ভিডিয়ো ও ছবি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই বিস্ময়ের ঝড় উঠেছে। অনেকেই প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেননি এই দৃশ্য বাস্তব নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি। কিন্তু স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও আবহাওয়া দফতরের রিপোর্টে নিশ্চিত হয়েছে— ঘটনাটি সত্যিই ঘটেছে। মরুভূমিতে বরফ পড়ার নজির অতীতে খুব কম হলেও, একেবারে নজিরবিহীন নয়। তাবুক অঞ্চল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৬০০ মিটার উঁচুতে হওয়ায় সেখানে মাঝেমধ্যে তুষারপাতের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তুষারপাতের নেপথ্যে একাধিক আবহাওয়াগত কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে। উপরের স্তরের বাতাসে অস্বাভাবিক ঠান্ডা ভাব, আর্দ্রতার প্রবাহ বৃদ্ধি, বায়ুমণ্ডলীয় চাপের পরিবর্তন এবং ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা হঠাৎ কমে যাওয়া— এই সব কিছুর নিখুঁত মেলবন্ধনেই মরুভূমিতে বরফ পড়েছে। এই ধরনের পরিস্থিতি খুবই বিরল, কিন্তু যখন ঘটে, তখন পুরো ভূদৃশ্যই বদলে যায়।
আগেও সৌদি আরবে এমন ঘটনা ঘটেছে। ২০১৬ সালে এবং পরে ২০২২ ও ২০২৪ সালেও কিছু অঞ্চলে তুষারপাতের খবর মিলেছিল। এমনকি সাহারা মরুভূমিতেও গত কয়েক দশকে তিন বার বরফ পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই কি এমন অস্বাভাবিক দৃশ্য ঘন ঘন দেখা যাচ্ছে— সেই প্রশ্ন উঠছে পরিবেশবিদদের মনে।
আবহাওয়া দফতর ইতিমধ্যেই সতর্কতা জারি করেছে। বজ্রঝড়, ভারী বৃষ্টি ও প্রবল বাতাসের আশঙ্কায় সাধারণ মানুষকে সাবধান থাকতে বলা হয়েছে। মরুর দেশে এই তুষারপাত এক দিকে যেমন মনোমুগ্ধকর, তেমনই ভবিষ্যৎ পরিবেশগত পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগও বাড়িয়ে তুলছে। প্রকৃতির এই উলটপুরাণ যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে— পৃথিবীর জলবায়ু দ্রুত বদলে যাচ্ছে, আর তার প্রভাব পড়ছে এমন সব জায়গায়, যেখানে তা একসময় কল্পনাতীত ছিল।