কৃষকের ছেলের উত্থান থেকে বিলাসের পাহাড়!
উত্তরপ্রদেশের উন্নাও জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলে অনুরাগ দ্বিবেদী। বাবার পেশা কৃষিকাজ, সংসারের রোজগার সীমিত। ছোটবেলা থেকেই অনুরাগের স্বপ্ন ছিল ক্রিকেটার হওয়ার। কিন্তু আর্থিক অনটনের কারণে ভালো প্রশিক্ষণের সুযোগ পাননি তিনি। স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার পর জীবনের গতিপথ বদলাতে শুরু করে। ক্রিকেট মাঠে নয়, ডিজিটাল দুনিয়াতেই নিজের ভাগ্য খুঁজে নেন অনুরাগ।
২০১৭ সালে মাত্র ৩০০ টাকা দিয়ে ফ্যান্টাসি ক্রিকেট খেলতে শুরু করেছিলেন তিনি। প্রথমে ছিল নিছক কৌতূহল, পরে তা হয়ে ওঠে আয়ের পথ। ২০১৮ সালে ইউটিউবে নিজের চ্যানেল খুলে ম্যাচের বিশ্লেষণ, ফ্যান্টাসি টিপস ও দল গঠনের পরামর্শ দিতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, ফ্যান্টাসি ক্রিকেট প্ল্যাটফর্ম থেকেই নাকি তিনি কয়েক বছরে ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা পর্যন্ত আয় করেছেন। এই দাবি তাঁকে রাতারাতি তারকা করে তোলে। বর্তমানে তাঁর ইউটিউব চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা প্রায় ৫০ লক্ষের কাছাকাছি।
সমাজমাধ্যমে অনুরাগ নিজেকে ‘ফ্যান্টাসি ক্রিকেটের মুখ’ বলে তুলে ধরতেন। ইউটিউবের পাশাপাশি ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, টেলিগ্রাম ও এক্স— সর্বত্রই তাঁর অনুগামীর সংখ্যা বিপুল। সেই জনপ্রিয়তার ছাপ পড়ে তাঁর জীবনযাপনে। গ্যারাজে জমতে থাকে একের পর এক বিলাসবহুল গাড়ি— ল্যাম্বরঘিনি উরুস, বিএমডব্লিউ জ়েড৪, মার্সিডিজ় বেঞ্জ ই-ক্লাস, ল্যান্ড রোভার ডিফেন্ডার। শুধু গাড়িই নয়, বিদেশে সম্পত্তি কেনা, দামি ঘড়ি ও বিলাসবহুল জীবনযাত্রা তাঁকে আলাদা করে নজরে আনে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে দুবাইয়ের এক বিলাসবহুল ক্রুজ়ে বসে তাঁর বিয়ের আসর। সেই বিয়ে ও তার জাঁকজমক ঘিরে সমাজমাধ্যমে শুরু হয় বিস্তর আলোচনা। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, একজন ইউটিউবার কী ভাবে এমন ব্যয়বহুল বিয়ের আয়োজন করতে পারেন। সেই প্রশ্নই ধীরে ধীরে পৌঁছে যায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের কানে।
ইডির তদন্তে উঠে আসে, অনুরাগের আয়ের বড় অংশ এসেছে অনলাইন বেটিং ও জুয়ার অ্যাপ থেকে, যা ভারতে বেআইনি। অভিযোগ, স্কাই এক্সচেঞ্জ ও অনুরূপ একাধিক জুয়ার অ্যাপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। শুধু ব্যবহারকারী নন, এই সব অ্যাপের প্রচারেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন অনুরাগ। ইউটিউব ভিডিও ও অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে মানুষকে ওই প্ল্যাটফর্মে টানার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
ইডির দাবি, অবৈধ এই আয়ের টাকা বিভিন্ন পথে পাচার করে বিলাসবহুল গাড়ি, সম্পত্তি ও অন্যান্য দামী সামগ্রী কেনা হয়েছে। এমনকি অনুরাগের সংস্থা ও পরিবারের সদস্যদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টেও সন্দেহজনক লেনদেনের খোঁজ মিলেছে। তদন্তে আরও কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে, যাঁদের বিরুদ্ধে বেনামি অ্যাকাউন্ট, টেলিগ্রাম চ্যানেল ও ডিজিটাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
এই সমস্ত তথ্যের ভিত্তিতেই বৃহস্পতিবার উন্নাওয়ে অনুরাগের বাড়িতে হানা দেয় ইডি। তল্লাশিতে বিপুল সম্পদের প্রমাণ পেয়ে তদন্তকারীরাও কার্যত হতবাক। এখন প্রশ্ন একটাই— কৃষকের ঘর থেকে উঠে আসা এই ইউটিউবারের সাফল্য কি সত্যিই পরিশ্রমের ফল, না কি অবৈধ আয়ের জাল? সেই উত্তর খুঁজতেই তদন্ত আরও জোরদার করেছে ইডি।