যশস্বীর হাত ধরে ক্রিকেটে নতুন সূচনা দাদা তেজস্বীর
যশস্বী জয়সওয়ালের জ্বলজ্বলে সাফল্যের পিছনে লুকিয়ে রয়েছে ত্যাগ, সংগ্রাম আর দুই ভাইয়ের গভীর সম্পর্কের এক অনন্য কাহিনি। ভারতীয় দলের ওপেনার যশস্বী যেমন আলোচনার কেন্দ্রে, তেমনই আলোচিত হয়ে উঠছেন তাঁর দাদা তেজস্বী জয়সওয়াল— যে পথ তিনি একসময় ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেই পথেই তাঁকে আবার ফিরিয়ে এনেছেন তাঁরই ছোট ভাই।
মুম্বইয়ে ক্রিকেট শেখার স্বপ্ন নিয়ে যশস্বীর সঙ্গে যাত্রা শুরু হয়েছিল তেজস্বীরও। কিন্তু প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও ভাগ্য সহায় হয়নি। পরিবারে দারিদ্র্য চেপে বসায় বড় ছেলে হিসেবে দায়িত্ব তাঁর কাঁধেই এসে পড়ে। নিজেদের খেলার খরচ চালানো সম্ভব নয় বুঝেই ক্রিকেটকে বিদায় জানান তেজস্বী। নিজের স্বপ্ন গুটিয়ে রেখে সেলসম্যানের চাকরি নেন দিল্লিতে। লক্ষ্য একটাই— সংসার চালানো এবং প্রতিভাবান ভাইটিকে ক্রিকেটার করে তোলা।
তেজস্বীর কথায়, তিনি জানতেন যশস্বীর প্রতিভা অনেক বড়। দু’জন একসঙ্গে মুম্বইয়ে খেলতে গেলেও ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়েন তেজস্বী, আর প্রতিটা ম্যাচেই রান করে নজর কাড়তে থাকেন যশস্বী। ফলে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেননি— তিনি নিজে পিছিয়ে দাঁড়ালেও ভাইয়ের স্বপ্নকে এগিয়ে দেবেন যেকোনও মূল্যে। প্রতিটি আঘাতের সঙ্গে ছিল একটাই আশা, ‘‘যখন যশস্বী দাঁড়াবে, আমিও আবার মাঠে ফিরব।’’
ভাই যখন জাতীয় দলে জায়গা করে ফেললেন এবং আর্থিকভাবে ঘর সামলে দাঁড়াল, তখনই তিনি প্রথম কাজটি করেন— দাদার হাতে ফিরিয়ে দেন ব্যাট। তেজস্বীকে আবার ক্রিকেটে ফেরানোই যেন তাঁর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। ভাইয়ের উৎসাহে নতুন করে শুরু হয় অনুশীলন। তেজস্বীও অনুভব করেন তাঁর পুরনো আগুন আবার জ্বলে উঠছে।
ক্লাবের হয়ে খেলতে খেলতেই সুযোগ আসে উত্তর-পূর্ব ভারতের দিকে নজর দেওয়ার। মুম্বই বা উত্তরপ্রদেশে সুযোগ পাওয়া কঠিন— তাই বেছে নেন নতুন পথ। ২০২৪ সালে ত্রিপুরার হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে। শুরুর ম্যাচগুলোয় ফল না পেলেও হাল ছাড়েননি তিনি। বডোদরার বিরুদ্ধে ৮২ রানের ইনিংস তাঁর আত্মবিশ্বাস ফেরায়। তবে ধারাবাহিকতার অভাবে জায়গা পাকা হয়নি।
এ বার সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফিতে উত্তরাখণ্ডের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচেই ৫১ রানের অর্ধশতরান করে তেজস্বী উঠে আসেন খবরে। একই দিনে এক দিনের ক্রিকেটে যশস্বীও করেন তাঁর প্রথম শতরান— দুই ভাইয়ের এই সাফল্য পরিবারের জন্য এক আবেগের মুহূর্ত।
তেজস্বী বলেন, ‘‘যশস্বী সব সময় বলত— তুমি পারবে। পারফর্ম করতে না পারলেও আত্মবিশ্বাস হারাবে না। ওর কথাই আমাকে শক্তি দিয়েছে বারবার।’’
২০১৯ সালে নতুন করে ক্রিকেটে ফেরা, ২০২১ সালে রাজস্থান রয়্যালসের নেটে বোলার হিসেবে সুযোগ পাওয়া— সব মিলিয়ে তেজস্বীর জীবন আবার ছন্দে ফিরে আসে। নেট বোলিং করতে করতেই তিনি অনুভব করেন নিজের পুরনো ছন্দ ফিরে পেয়েছেন।
তেজস্বীর শেষ কথা, ‘‘আমি কোনও ত্যাগ করিনি। বড় ছেলে হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। যশস্বী প্রতিভাবান ছিল, তাই ওকে এগিয়ে দিয়েছি। আজ যে জায়গায় ও পৌঁছেছে, সেটা পরিশ্রম আর বিশ্বাসের ফল।’’
এখন যশস্বী দাদাকে আর কোনও চাকরি করতে দেন না। শুধু বলেন— ‘‘খেলো। যতদিন ইচ্ছে খেলো।’’ তাই ভাইয়ের হাত ধরেই ছুটছেন তেজস্বী, নতুন লক্ষ্য এখন ত্রিপুরার মূল দলে জায়গা পাকা করা।