শাস্ত্রীয় সঙ্গীতজগতে শোকের ছায়া!
ভারতের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আকাশে নেমে এল গভীর শোক। উত্তর ভারতের বেনারস ঘরানার কিংবদন্তি গায়ক পণ্ডিত ছন্নুলাল মিশ্র আর নেই। বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে চারটে নাগাদ উত্তরপ্রদেশের মির্জাপুরে নিজের বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর।
পণ্ডিত ছন্নুলালের প্রয়াণে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতজগতে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সঙ্গীতের সাধনাতেই ডুবে ছিলেন এই বর্ষীয়ান শিল্পী। জানা গিয়েছে, বুধবার রাত থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। তখনই তাঁকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে সেখানে পৌঁছনোর আগেই তিনি প্রাণত্যাগ করেন। হাসপাতালের তরফে তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাঁর শেষকৃত্য বারাণসীর ঘাটে সম্পন্ন করা হবে। ইতিমধ্যেই মরদেহ সেখানে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। পুত্র তথা তবলাশিল্পী রামকুমার মিশ্র দিল্লি থেকে মির্জাপুরের পথে রওনা দিয়েছেন বাবার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে। বিমানের টিকিট না পাওয়ায় তিনি সড়কপথেই যাত্রা শুরু করেন এবং বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার মধ্যে পৌঁছে যাওয়ার কথা।
গত কয়েক মাস ধরেই নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন পণ্ডিত ছন্নুলাল। চলতি বছরের ১১ সেপ্টেম্বর থেকে তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। মির্জাপুর মেডিক্যাল কলেজের ১৫ জন চিকিৎসকের একটি বিশেষ দল তাঁর চিকিৎসার দায়িত্বে ছিল এবং তাঁর ইচ্ছানুযায়ী চিকিৎসা চলছিল বাড়িতেই। শেষের দিকে তাঁর রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায়, হিমোগ্লোবিন বিপজ্জনকভাবে কমে যায় এবং শ্বাসযন্ত্রেও জটিলতা দেখা দেয়।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখলে সাময়িক উপশম হতে পারত। কিন্তু শিল্পী নিজেই স্পষ্টভাবে অনুরোধ করেছিলেন, তাঁকে যেন কখনও ভেন্টিলেশনে রাখা না হয়। তাঁর সেই ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বিকল্প চিকিৎসার পথেই এগোন ডাক্তাররা।
ভারতের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জগতে পণ্ডিত ছন্নুলাল মিশ্র এক অমূল্য নাম। বেনারস ঘরানার অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে তিনি খেয়াল, ঠুংরি, দাদরা, কাজরি এবং ভজন গানের মাধ্যমে অগণিত শ্রোতার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। তাঁর গানের মধ্যে ছিল এক অনন্য স্নিগ্ধতা ও গভীরতা, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতি অনুরাগী করেছে।
শুধু ভারতে নয়, বিশ্বের নানা প্রান্তে ছন্নুলাল মিশ্রের গানের ভক্ত ছড়িয়ে ছিলেন। তাঁর কণ্ঠে বেনারস ঘরানার ঐতিহ্য নতুন প্রাণ পেয়েছিল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সঙ্গীত সাধনায় অবিচল ছিলেন, যার সাক্ষী থেকেছে অসংখ্য ছাত্রছাত্রী ও সঙ্গীতপ্রেমী।
পণ্ডিত ছন্নুলালের প্রয়াণে ভারতীয় সঙ্গীতমঞ্চে তৈরি হল এক গভীর শূন্যতা। যে মানুষটি সারা জীবন ধরে সুর ও সাধনার মাধ্যমে শ্রোতাদের মন জয় করে গিয়েছিলেন, তাঁর অনুপস্থিতি পূরণ করা অসম্ভব। তবে তাঁর রেখে যাওয়া অমূল্য সৃষ্টি ও অবদান আগামীতেও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতপ্রেমীদের অনুপ্রেরণা জোগাবে।
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে সঙ্গীতপ্রেমীরা বিদায় জানাচ্ছেন বেনারস ঘরানার এই কিংবদন্তিকে। তাঁর সুরেলা কণ্ঠ ও অনন্য পরিবেশনা আজ ইতিহাস হয়ে গেলেও, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মর্মস্থলে চিরজীবী হয়ে থাকবেন পণ্ডিত ছন্নুলাল মিশ্র।