অপমানের ভারে ভেঙে পড়া কৃষ্ণেন্দুর পরিবারে বিষণ্ণ উৎসব!
গোঁসাইবেড় গ্রামের এক সাধারণ পরিবারের কাছে দুর্গাপুজো মানে ছিল আনন্দের দিন। মাঠে ছেলের ফুটবল খেলা, প্যান্ডেল ঘোরা, মণ্ডপে সাইকেল চালিয়ে যাওয়া—এই নিয়েই কেটেছে এতদিন। কিন্তু এ বছর পুজো যেন তাদের জীবনে অভিশাপ হয়ে ফিরে এসেছে। কৃষ্ণেন্দু দাস নেই আর। অপমানের ভার সইতে না পেরে সে নিজের জীবন শেষ করেছে। আর সেই ঘটনার পর থেকে মা সুমিত্রার মুখে একটাই কথা, “আমাদের জীবনে আর পুজো আসে না। বরং পুজোটা শেষ হলেই একটু বাঁচি।”
কৃষ্ণেন্দু ছিল এক ফুটবলপাগল ছেলে। গ্রামের কোচও বিশ্বাস করতেন, ওর পা থেকে বল ছুটলে গোল হবেই। ছোট্ট সাইকেল চেপে প্রতিদিন মাঠে যেত প্র্যাকটিসে। বাবা জগন্নাথের কাছ থেকে টাকা নিয়ে কিনেছিল নিজের প্রিয় ফুটবল বুট আর সিনগার্ড। আজ সেই বুট, সেই খেলাধুলার ব্যাগ ধুলো জমে পড়ে আছে ঘরের কোণে। মা সুমিত্রা বারবার চোখের জল মুছে বলছিলেন, “ও চুরি করেনি। কুরকুরে কুড়িয়ে পেয়েছিল, পরে পয়সাও দিয়েছিল। তবু ‘চোর’ বলে ধাওয়া করল। পুলিশে দেবে বলল। এই অপমান ও সহ্য করতে পারেনি।”
ঘটনার পর থেকেই বদলে গেছে সবকিছু। যে বাড়িতে হাসি-খুশির মধ্যে দিন কাটত, আজ সেখানে নেমে এসেছে মৃত্যু নীরবতা। জগন্নাথ আর সুমিত্রা মেয়েকে নিয়ে আগের ভাড়া বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছেন। কারণ, স্থানীয়দের হুমকি – না গেলে ‘আরজি করের মতো করে দেবে’। ভয় আর লজ্জার চাপে তারা এখন হাউরের কাছে একটি কোচিং হোস্টেলে থাকেন।
গ্রামের পথে হাঁটলে বোঝা যায়, কৃষ্ণেন্দুর অনুপস্থিতি কতটা গভীর। রাধাবাজারের সেই ‘সম্পূর্ণ নিরামিষ মিষ্টির দোকান’ আজও বন্ধ পড়ে আছে, ঘটনার পর থেকে আর খোলেনি। কাছেই দুর্গাপ্রতিমা গড়ার কাজ চলছে, মাঠে পুজোর প্রস্তুতিও তুঙ্গে। কিন্তু কৃষ্ণেন্দু, যে ছেলেটি সব সময় পুজোর সময় এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াত, মণ্ডপ থেকে মণ্ডপে সাইকেল চালিয়ে যেত, তাকে আর দেখা যায় না।
কৃষ্ণেন্দুর ঘরের সামনে এখন ঝোপঝাড়ে ঢাকা ঢালু পথ। শ্যাওলা আর শুকনো পাতায় পিছলে যায় পা। বাড়ির বারান্দা ধুলোয় ভরা, দরজার ফ্রেমে ঝুলছে পুরনো ব্যাগ। সুমিত্রা অতিথিদের বসার জন্য ছেঁড়া কার্ডবোর্ড বিছিয়ে দেন। বহুদিন আলো জ্বলে না এ বাড়িতে। যেন জীবনের আলোও নিভে গিয়েছে সেই দিন থেকেই।
ছেলেটি শুধু খেলায় নয়, পড়াশোনায়ও ভালো ছিল। বাকুলদা হাই স্কুলে নিয়মিত ভালো নম্বর পেত, নাটকেও অংশ নিত। দিদি মধুরিমার সঙ্গে ছিল গভীর সম্পর্ক। এ বছর মাধ্যমিক দেবে মধুরিমা, কিন্তু ভাইকে ছাড়া তার সেই পথচলায় আনন্দ নেই।
আজও মা-বাবা বিশ্বাস করেন, কৃষ্ণেন্দু চুরি করেনি। সমাজের অবিশ্বাস ও অপমানের ভার সইতে না পেরে সে চলে গেছে। এখন সুমিত্রা শুধু বলেন, “পুজো এখন আমাদের কাছে আনন্দ নয়, যন্ত্রণা। চারদিকের আলো-আয়োজন চোখে লাগে। ও থাকলে এই পুজোয় মাঠে খেলত, প্রতিমা দেখতে যেত। এখন পুজো এলেই মনে হয়, কখন শেষ হবে এইসব…”
কৃষ্ণেন্দুর গল্প শুধুই এক পরিবারের নয়—এটি এক সমাজের প্রতিচ্ছবি, যেখানে একটি মিথ্যা অপবাদ কাড়ে এক তরুণ প্রাণ, আর পুজোর মতো উৎসবও হয়ে ওঠে বিষাদময়।
‘সত্যমেব জয়তে’! দিল্লি হাই কোর্ট আবেদন খারিজ, সমীরের মন্তব্যে নতুন ইঙ্গিত?