কার্বন ডাই অক্সাইডকে ‘দূষণকারী’ থেকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব!
আমেরিকায় আবারও জলবায়ু নিয়ে বড়সড় বিতর্কের সূচনা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইপিএ) জানিয়েছে, কার্বন ডাই অক্সাইডকে (CO2) এতদিন যেভাবে দূষণকারী হিসেবে ধরা হত, সেটি পুরোপুরি সঠিক নয়। তাই তাকে ‘গ্রিনহাউস গ্যাস’-এর তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
বিতর্কের সূচনা
২০০৭ সালে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ‘দূষণহীন বায়ু আইন’-এর অধীনে CO2-কে গ্রিনহাউস গ্যাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ নানা শিল্পে কার্বন নির্গমন নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু সম্প্রতি ইপিএ ঘোষণা করেছে, তারা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের সীমারেখা বদলাতে চাইছে। এর জেরে জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলির ক্ষমতা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিবেশবিদদের দাবি, শিল্পগোষ্ঠীর চাপেই এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে ট্রাম্প সরকার।
বিজ্ঞানীদের মতভেদ
একদল বিজ্ঞানীর মতে, ইপিএ-র প্রস্তাব যথার্থ। কারণ, স্বাভাবিক মাত্রায় কার্বন ডাই অক্সাইড মানবজীবনের জন্য অপরিহার্য। প্রাণীকুলের শ্বাসপ্রশ্বাস থেকে শুরু করে উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষ—সব ক্ষেত্রেই এই গ্যাসের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। তবে, অতিরিক্ত মাত্রায় এটি প্রাণঘাতী হতে পারে, কারণ তা বাতাসের অক্সিজেনকে প্রতিস্থাপন করে শ্বাসকষ্টের কারণ হয়।
অন্যদিকে, পরিবেশপ্রেমী এবং গবেষকদের একাংশ বলছেন, CO2-কে দূষণকারী হিসেবে গণ্য না করলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বড় ক্ষতি হবে। তাঁদের বক্তব্য, শিল্প ও যানবাহন থেকে নির্গত কার্বনই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মূল কারণ। প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় বর্তমানে বায়ুমণ্ডলে CO2-র পরিমাণ ৫০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। যা নিঃসন্দেহে উদ্বেগের।
আইনি টানাপড়েন
এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আইনি লড়াইও শুরু হয়ে গেছে। অলাভজনক সংস্থা আর্থজাস্টিস অভিযোগ তুলেছে, ট্রাম্প সরকার ইপিএ-র মাধ্যমে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা খর্ব করতে চাইছে। তাঁদের মতে, শিল্পগুলিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা না গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মত
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যানিয়েল ভিশনি জানিয়েছেন, বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের দুটি উৎস রয়েছে—প্রাকৃতিক (আগ্নেয়গিরি, দাবানল, পচন) এবং মানবসৃষ্ট (শিল্প, যানবাহন)। কিন্তু মনুষ্যসৃষ্ট কার্বন নির্গমন প্রাকৃতিক উৎসের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি। তাই নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। তবে একইসঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেন, জীবনের ধারাবাহিকতার জন্য নির্দিষ্ট মাত্রায় CO2 অপরিহার্য।
ইতিহাসের প্রেক্ষাপট
উল্লেখযোগ্যভাবে, ১৯৭০ সালে পাশ হওয়া মার্কিন ‘দূষণহীন বায়ু আইন’ বা ১৯৯০ সালের সংশোধনীতেও কার্বন ডাই অক্সাইডকে দূষণকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। সম্প্রতি ট্রাম্প সরকারের শক্তি বিভাগ যে ১৪১ পাতার রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, সেখানে বলা হয়েছে—CO2-কে গ্রিনহাউস গ্যাস থেকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাবের পেছনে বৈজ্ঞানিক যুক্তি রয়েছে।
সামনে কী?
বর্তমানে ইপিএর সিদ্ধান্ত নিয়ে গণশুনানি শুরু হতে চলেছে। এর ফলাফল কী হবে, তা এখনও অনিশ্চিত। তবে একথা স্পষ্ট যে, কার্বন ডাই অক্সাইডকে দূষণকারী হিসেবে গণ্য করা উচিত কি না—সে নিয়ে আমেরিকা এখন দ্বিধাবিভক্ত। একপাশে রয়েছে পরিবেশ রক্ষার দায়, অন্যপাশে শিল্পোন্নয়ন এবং অর্থনীতির চাপ। এই দ্বন্দ্বের সমাধানই এখন গোটা বিশ্বের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু।
পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে বসতে রাজি জ়েলেনস্কি, তবে আগাম শর্তে নয়