লাদেনের পথ ধরে জুলানির ভবিষ্যৎ
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের বিদ্রোহী নেতা আবু মহম্মদ আল-জুলানি এবং কুখ্যাত সন্ত্রাসী ওসামা বিন লাদেনের মধ্যে অবিশ্বাস্য মিল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই মিলের সূত্র ধরেই উঠে আসছে এক প্রশ্ন— যুক্তরাষ্ট্র কি শেষ পর্যন্ত জুলানিকেও লাদেনের মতো একই পরিণতির মুখে ঠেলে দেবে?
লাদেন এবং জুলানি: নাম থেকে জন্মস্থান
লাদেন এবং জুলানি দু’জনের নামেই তিনটি বর্ণ। দু’জনের জন্ম সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াধে। লাদেন জন্মেছিলেন ১৯৫৭ সালের ১০ মার্চ। অন্যদিকে, ১৯৮২ সালে জন্ম হয় আহমেদ হুসেন আল-সারা নামের এক ব্যক্তির, যিনি পরবর্তীতে আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে নিজের নাম পরিবর্তন করে হয়ে যান আবু মহম্মদ আল-জুলানি।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসনের পর, মুজাহিদিন বাহিনীর নেতৃত্বে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্ত হন বিন লাদেন। একইভাবে, সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন জুলানি। রাশিয়া আসাদের মিত্র হওয়ায় জুলানির বিদ্রোহ কার্যত রাশিয়ার বিরুদ্ধেই লড়াই হিসেবে গণ্য হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকায় মিল
লাদেনকে একসময় যুক্তরাষ্ট্র প্রশংসা করত এবং তাদের স্বার্থে কাজে লাগিয়েছিল। আফগানিস্তানে সোভিয়েত-বিরোধী মুজাহিদিনদের অস্ত্র সরবরাহ এবং পরিচালনায় লাদেনের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। একইভাবে, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে আসাদবিরোধী বিদ্রোহীদের মদত দিতে যুক্তরাষ্ট্র জুলানিকে ব্যবহার করেছে। তাদের অস্ত্র ও রসদের যোগান দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্কের মাধ্যমে।
লাদেনের মতোই বিদ্রোহী নেতা
২০০৩ সালে জুলানি আল কায়দায় যোগ দেন। পরবর্তীতে ২০১১ সালে তিনি আল কায়দার অধীনে নতুন শাখা তৈরি করেন, যা পরে হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) নামে পরিচিত হয়। এই সংগঠন সিরিয়ার দামাস্কাসের নিয়ন্ত্রণ নেয়, যা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষা করেছে।
লাদেনের পরিণতি এবং জুলানির ভবিষ্যৎ
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে সন্ত্রাসী হামলার পর বিন লাদেনকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শত্রু’ ঘোষণা করা হয়। প্রায় এক দশক পর, ২০১১ সালের ২ মে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে অভিযান চালিয়ে লাদেনকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র।
এই ঘটনার মতোই, জুলানির ক্ষেত্রেও একই রকম পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক সমর্থন পাওয়া সত্ত্বেও, ভবিষ্যতে জুলানির বিদ্রোহী সংগঠন যদি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে তাঁর পরিণতিও লাদেনের মতো হতে পারে বলে অনেকের ধারণা।
আইএসআইএসের সঙ্গে জুলানির সম্পর্ক
জুলানি একসময় আইএসআইএস প্রধান আবু বকর আল-বাগদাদির ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। কিন্তু ২০১৩ সালে তাঁদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়। জুলানি দাবি করেন, বাগদাদি তাঁর নুসরা ফ্রন্ট দখল করতে চেয়েছিলেন। তবে এই সম্পর্ক ছিন্ন করলেও, জুলানির অতীত আইএসআইএসের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি
জুলানি এখন যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে নিজেকে আসাদ সরকারের একনায়কত্বের বিরুদ্ধে একজন গণতান্ত্রিক বিদ্রোহী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। তবে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, লাদেনের মতোই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ হলে, জুলানির উপর থেকে সমর্থন সরিয়ে নেওয়া হতে পারে এবং তাঁর জীবন বিপন্ন হতে পারে।
শেষ কথা
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, যাদের একসময় যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দিয়েছে, প্রয়োজন ফুরালে তাদেরই শত্রু বানিয়েছে। লাদেনের মতো, জুলানিও সেই একই পরিণতির পথে হাঁটছেন বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই। ভবিষ্যতে জুলানির কী হবে, তা সময়ই বলে দেবে।