মাতৃত্বের নকল আশ্বাসে প্রতারণার ফাঁদ
নাইজিরিয়ায় এক চাঞ্চল্যকর জালিয়াতি চক্রের খবর সামনে এসেছে। সন্তানসুখ থেকে বঞ্চিত নারীদের লক্ষ্য করে ফাঁদ পেতেছে একদল ভুয়ো চিকিৎসক। মিথ্যা গর্ভধারণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসব অসাধু ক্লিনিক কোটি কোটি টাকার ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এ ধরনের প্রতারণা শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, নারীদের শারীরিক ও মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে।
সামাজিক চাপে মাতৃত্বের মরিয়া খোঁজ
নাইজিরিয়ায় মাতৃত্বের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেসব নারী সন্তান জন্ম দিতে সক্ষম নন, তাঁদের সমাজের চাপ সহ্য করতে হয়। এই সামাজিক অপমান এবং বন্ধ্যাত্বের কলঙ্ক এড়ানোর জন্য অনেক নারী মরিয়া হয়ে ভুয়ো ক্লিনিকগুলোর শরণাপন্ন হচ্ছেন। এসব ক্লিনিকের কর্মীরা অলৌকিক চিকিৎসার কথা বলে নারীদের বিশ্বাস করায়, তারা সন্তান ধারণে সক্ষম হবেন।
প্রতারণার পদ্ধতি
বিবিসির প্রতিবেদনে জানা যায়, এই ক্লিনিকগুলোর মাধ্যমে নারীদের শরীরে বিভিন্ন পদার্থ প্রবেশ করিয়ে স্ফীতোদর তৈরি করা হয়। এরপর তাঁদের বোঝানো হয় যে তাঁরা গর্ভবতী। এক্ষেত্রে বিশেষ ধরনের ইঞ্জেকশন এবং পানীয় ব্যবহার করা হয়। নারীদের নিষেধ করা হয় হাসপাতাল বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে গিয়ে পরীক্ষা করাতে। প্রতারণার ফাঁদ এতটাই শক্তিশালী যে অনেক নারী প্রায় ১৫ মাস ধরে ‘গর্ভবতী’ থাকার গল্প বিশ্বাস করেছেন। তাঁদের জানানো হয় যে, চিকিৎসার প্রক্রিয়া অলৌকিক, এবং সন্তান প্রসব করতে সময় বেশি লাগবে।
প্রসবের নাটক এবং শিশু পাচারের দালাল
‘প্রসব’-এর সময় ক্লিনিকগুলো নারীদের ব্যয়বহুল ওষুধ কিনতে বাধ্য করে। এরপর অস্ত্রোপচারের নামে নারীদের শরীরে চিহ্ন তৈরি করে ভুয়ো চিকিৎসকরা। ওই সময় তাঁদের এমন ইনজেকশন দেওয়া হয় যাতে তাঁরা আচ্ছন্ন হয়ে যান। পরবর্তীতে তাঁদের সন্তানের বদলে অন্য কোনো মায়ের সন্তান হাজির করা হয়। এই শিশুদের সাধারণত দরিদ্র পরিবারের কাছ থেকে জোর করে বা টাকা দিয়ে কেনা হয়।
পুলিশের অভিযানে জালিয়াতির পর্দাফাঁস
সরকারি অভিযানের পর এসব ক্লিনিকের ভয়ানক সত্য সামনে এসেছে। অনেক নাবালিকাকে এসব জায়গা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, যাঁদের আটকে রাখা হয়েছিল। তাঁদের সন্তান জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল এবং সেই শিশুদের মিথ্যা গল্প সাজিয়ে অন্য নারীদের সন্তান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, এই চক্রটি শিশু কেনাবেচার একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের অংশ বলেও সন্দেহ করা হচ্ছে।
সমাজে প্রতারণার বিস্তার
এই ধরনের প্রতারণা শুধুমাত্র নাইজিরিয়া নয়, অন্যান্য দেশেও এ ধরনের জালিয়াতি দেখা গেছে। সন্তানসুখের জন্য নারীকে যে সামাজিক চাপ এবং মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়, তা তাঁদের এই ধরনের ফাঁদে পা দিতে বাধ্য করে।
সমাধানের উপায়
এই ধরনের প্রতারণা বন্ধ করার জন্য সরকারের কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। জনসচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি যাতে মানুষ এ ধরনের ভুয়ো চিকিৎসার ফাঁদে পা না দেন। সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা না থাকলেও, সমাজে নারীদের সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করার অধিকার রয়েছে। এ বিষয়ে শিক্ষার প্রসার এবং সচেতনতা বাড়ালে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
নারীর মাতৃত্ব একটি অনুভবের বিষয়, যা কখনোই প্রতারণার শিকার হওয়ার মতো কিছু নয়। প্রতারকদের হাত থেকে মুক্তি পেতে এবং এই চক্র ধ্বংস করতে আইনের প্রয়োগ আরও জোরদার হওয়া প্রয়োজন। সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে এই ধরনের প্রতারণা বন্ধ করতে। মাতৃত্বের মতো একটি পবিত্র বিষয়কে ব্যবহার করে যে অপরাধ করা হচ্ছে, তা অত্যন্ত নিন্দনীয়।