নারীহত্যার ৬০ শতাংশ ঘটছে!
মেয়েদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা কোথায়? পথঘাট, কর্মস্থল বা অন্য কোনো জনসমাগম স্থল নয়—এই জায়গাটি আর কোথাও নয়, বরং তাদের নিজেদের বাড়ি। সম্প্রতি রাষ্ট্রপুঞ্জ প্রকাশিত একটি রিপোর্টে জানানো হয়েছে, নারীহত্যার ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রেই হত্যাকারী হিসেবে উঠে আসছে ঘনিষ্ঠ সঙ্গী বা পরিবারের সদস্যদের নাম। এই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। গার্হস্থ্য হিংসা, পণের জন্য হত্যা বা পারিবারিক অশান্তির ফলে কেন এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটছে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
নারীহত্যার ভয়াবহ চিত্র
২০২৩ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের মহিলা ড্রাগ এবং অপরাধ দফতরের প্রকাশিত ৩২ পাতার রিপোর্টে জানানো হয়েছে, প্রতি দিন গড়ে ১৪০ জন নারী খুন হয়েছেন। এর মধ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হত্যাকারী ছিলেন তাদের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী বা পরিবারের সদস্য। বিশ্বব্যাপী নারী সুরক্ষার এই উদ্বেগজনক চিত্রটি প্রকাশিত হয় ২৫ নভেম্বর, ‘আন্তর্জাতিক নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা নির্মূল দিবস’-এর দিনে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, গত বছর দুনিয়াজুড়ে প্রায় ৮৫ হাজার নারী হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৫১ হাজার ১০০ জন খুন হয়েছেন ঘনিষ্ঠ সঙ্গী বা পরিবারের সদস্যদের হাতে। এই সংখ্যা ২০২২ সালের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
মহাদেশভিত্তিক পরিসংখ্যান
রাষ্ট্রপুঞ্জের এই রিপোর্টে মহাদেশভিত্তিক পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে।
- আফ্রিকা: নারীহত্যার ক্ষেত্রে আফ্রিকা শীর্ষস্থানে রয়েছে। সেখানে প্রতি ১ লক্ষ জনসংখ্যায় ২.৯ জন নারী খুন হয়েছেন। ২০২৩ সালে মোট ২১ হাজার ৭০০ নারী খুন হয়েছেন এই মহাদেশে।
- আমেরিকা: দ্বিতীয় স্থানে থাকা আমেরিকায় প্রতি লক্ষে মৃত্যুহার ১.৬। সেখানে গত বছর খুন হয়েছেন ৮ হাজার ৩০০ নারী।
- ওশিয়ানিয়া: ৩০০ জন নারীর মৃত্যুর সঙ্গে প্রতি লক্ষে মৃত্যুহার ১.৫।
- এশিয়া ও ইউরোপ: যথাক্রমে চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে থাকা এই মহাদেশগুলিতে মৃত্যুহার কম। এশিয়ায় প্রতি লক্ষে ০.৮ এবং ইউরোপে ০.৬।
লিঙ্গভিত্তিক হিংসার আসল কারণ
রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, পুরুষদের তুলনায় নারীদের হত্যা মূলত গার্হস্থ্য হিংসার কারণেই হয়। পুরুষদের বেশিরভাগ হত্যা বাড়ির বাইরের পরিবেশে ঘটে। রাষ্ট্রপুঞ্জের ‘ফেমিনিসাইড ইন ২০২৩’ শীর্ষক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, পুরুষদের খুনের সংখ্যা মোট হত্যাকাণ্ডের ৮০ শতাংশ হলেও নারীদের হত্যার ক্ষেত্রে গার্হস্থ্য হিংসার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।
রাষ্ট্রপুঞ্জের মহিলা দফতরের ডেপুটি এগজ়িকিউটিভ ডিরেক্টর নিয়ারাদজায়ি গুম্বনজভান্ডা বলেছেন, ‘‘গার্হস্থ্য হিংসার মূল কারণ হল নারীদের ওপর পুরুষের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। যখনই নারীরা এর প্রতিবাদ করেন, তখনই তাদের ওপর অত্যাচার নেমে আসে।’’
কীভাবে সমাধান সম্ভব?
রাষ্ট্রপুঞ্জের মতে, কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন। পরিবারে নারীর অধিকার এবং মর্যাদাকে সুরক্ষিত করতে হলে সমাজের সমস্ত স্তরে সমতা এবং সম্মানের ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
উদ্বেগ এবং করণীয়
নারী সুরক্ষার জন্য উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো আইন প্রণয়ন করেছে, তবুও বাস্তব চিত্র উদ্বেগজনক। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন করে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। নারীদের নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজন সমগ্র সমাজে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন।
রাষ্ট্রপুঞ্জের এই রিপোর্ট আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। নারীদের সুরক্ষার প্রশ্নে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, নইলে বাড়ি নামক নিরাপদ আশ্রয়স্থলটাই তাদের জন্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত হবে।