ইজরায়েলের সাফল্যের রহস্য
ছোট আয়তনের দেশ হলেও ইজরায়েল আজ বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্রের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। মাথাপিছু আয়ের নিরিখে পশ্চিম এশিয়ার অন্যান্য দেশকে পেছনে ফেলে সৌদি আরব, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রকেও ছাপিয়ে গেছে। তবে ইজরায়েলের এই অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সাফল্য কীভাবে সম্ভব হল, তা বিশ্লেষণ করলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে।
ছোট্ট দেশ, বিশাল সাফল্য
ইজরায়েলের প্রতিষ্ঠা ১৯৪৮ সালে। তবে জন্মলগ্ন থেকেই এই দেশ যুদ্ধ, সংঘাত এবং ধর্মীয় সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এর ভৌগোলিক আয়তন ছোট এবং প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমাণও খুবই কম। তা সত্ত্বেও ইজরায়েল গত চার দশকে বিশ্বমঞ্চে তার নিজস্ব শক্তি ও প্রভাব প্রতিষ্ঠা করেছে।
প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব সত্ত্বেও ইজরায়েল শুধু পশ্চিম এশিয়ার নয়, পুরো বিশ্বের মধ্যেই অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে। ২০২৩ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের জিডিপি ৪২ লক্ষ ২৮ হাজার কোটি টাকা ছুঁয়েছে।
সাফল্যের পিছনে অর্থনৈতিক সংস্কার
ইজরায়েলের বর্তমান আর্থিক সাফল্যের মূলে রয়েছে ১৯৮৫ সালের অর্থনৈতিক সংস্কার। তখন দেশের অর্থনীতি মুদ্রাস্ফীতির কবলে পড়ে প্রায় ধ্বংসের মুখে। মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ৪৫০ শতাংশ, যা নাগরিকদের জীবনযাত্রার মানের উপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছিল।
তৎকালীন সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে বেশ কিছু সাহসী পদক্ষেপ নেয়। প্রথমত, সরকারি ভর্তুকি প্রত্যাহার করা হয়। খাদ্য, পরিবহণ এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত, ইজরায়েলি মুদ্রা শেকেলের মান কমিয়ে পণ্য রফতানিকে উৎসাহিত করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ককে আরও ক্ষমতাসম্পন্ন করে তোলা হয়। এই সংস্কারগুলো দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করে।
প্রযুক্তি ও স্টার্টআপের উত্থান
ইজরায়েলের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে প্রযুক্তি এবং স্টার্টআপ সংস্কৃতি। দেশটিতে বর্তমানে ৪,০০০-এরও বেশি প্রযুক্তি সংস্থা রয়েছে, যার মধ্যে বহু সংস্থা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয়। তেল আভিভে বিশ্বের প্রধান ৫০০টি সংস্থার মধ্যে ৮০টির গবেষণাকেন্দ্র রয়েছে।
এছাড়া ইজরায়েলের স্টার্টআপ পরিবেশকে বলা হয় “Startup Nation”। ছোট আকারের দেশ হওয়া সত্ত্বেও এখানে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা স্টার্টআপের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, চিকিৎসা প্রযুক্তি এবং কৃষি প্রযুক্তিতে ইজরায়েল উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে।
রফতানির ভূমিকা
ইজরায়েলের অর্থনৈতিক সাফল্যের অন্যতম স্তম্ভ হল রফতানি। হিরে, সার, ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের মতো পণ্যের চাহিদা বিশ্বজুড়ে রয়েছে। এই পণ্যগুলো রফতানি করে দেশটি বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে।
শিক্ষা ও গবেষণায় অগ্রগতি
ইজরায়েলের সাফল্যের আরেকটি প্রধান কারণ এর শক্তিশালী শিক্ষা ব্যবস্থা। ১৯২০ সালে জেরুজালেমে প্রতিষ্ঠিত ‘হিব্রু ইউনিভার্সিটি’ থেকে শুরু করে বর্তমানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের দিক দিয়ে ইজরায়েল বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে।
উন্নত গবেষণা এবং উদ্ভাবনের মাধ্যমে ইজরায়েল নিজেকে উচ্চ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
জল ও কৃষিক্ষেত্রে বিপ্লব
প্রতিষ্ঠার সময় ইজরায়েলে জল এবং উর্বর ভূমির সংকট ছিল। তবে অত্যাধুনিক সেচ প্রযুক্তি এবং জল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশটি মরুভূমিকে চাষযোগ্য জমিতে পরিণত করেছে। কৃষিক্ষেত্রে ইজরায়েলের সাফল্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক
ইজরায়েলের সামরিক এবং অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধির পেছনে আমেরিকার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মার্কিন বিনিয়োগ এবং সহযোগিতা দেশটির প্রতিরক্ষা এবং প্রযুক্তিগত বিকাশকে ত্বরান্বিত করেছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ইজরায়েলের মাথাপিছু আয় বর্তমানে ৪২ লক্ষ টাকার কাছাকাছি। এটি পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সিঙ্গাপুর এবং কাতারের পরেই অবস্থান করছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতির এই ধারা বজায় থাকলে ইজরায়েল আরও বড় লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে।
অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, শক্তিশালী শিক্ষা ব্যবস্থা, সাহসী অর্থনৈতিক সংস্কার এবং কৌশলগত সম্পর্কের মাধ্যমে ইজরায়েল শুধু পশ্চিম এশিয়ার নয়, গোটা বিশ্বের জন্যই এক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।