১০৮ ডলারে অপরিশোধিত তেল, ফের বিশ্বে মন্দার আশঙ্কা?
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের আঁচ এবার আরও স্পষ্ট ভাবে পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। হরমুজ়ের পর বাব এল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত বাড়ছে অপরিশোধিত তেলের দাম। ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া তেলের দামে নতুন করে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে তেলের দাম বাড়লেই যে অবধারিত ভাবে মন্দা আসবে, এমনটা মনে করছেন না বিশেষজ্ঞদের সবাই।
বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে জ্বালানির সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। কলকারখানা চালানো থেকে যাত্রী ও পণ্য পরিবহণ— প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তেলের প্রয়োজন। ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে উৎপাদন ও পরিবহণের খরচও বেড়ে যায়। তার প্রভাব পড়ে পণ্য ও পরিষেবার দামে। অর্থাৎ, তেলের দর বৃদ্ধির সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে।
ইতিহাসেও এর নজির রয়েছে। ১৯৭৩ সালের ইয়ম কিপ্পুর যুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গিয়েছিল। তার প্রভাব পড়েছিল মার্কিন অর্থনীতিসহ বিশ্বের একাধিক দেশের উপর। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের সময়ও তেল উৎপাদন কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধাক্কা লাগে। মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে মুদ্রাস্ফীতি।
১৯৯০ সালে ইরাক কুয়েত দখল করার পরও একই রকম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। বিপুল পরিমাণ তেল সরবরাহ বাজার থেকে কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অস্থিরতা বাড়ে। সেই সময় ভারতও তীব্র আর্থিক সঙ্কটে পড়েছিল। বিদেশি মুদ্রার ভান্ডার প্রায় তলানিতে পৌঁছনোয় আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার বা আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়েছিল নয়াদিল্লিকে। সরকারি সোনা বিদেশের ব্যাঙ্কে গচ্ছিত রাখার ঘটনাও ঘটেছিল।
২০০৮ সালেও অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১৪৭ ডলারে পৌঁছেছিল। একই সময়ে দ্রুত বাড়ছিল ভারত ও চিনের মতো দেশগুলির জ্বালানির চাহিদা। বিশ্ব অর্থনীতিতে সেই সময়ও বড় ধাক্কা এসেছিল। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে ১০৮ ডলারের তেল নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করলেও, শুধু এই একটি কারণ দেখেই বিশ্ব মন্দার পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন।
তবে ভারতের জন্য ঝুঁকি একেবারেই কম নয়। দেশটি বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে আমদানি খরচও বাড়ে। এর প্রভাব পড়তে পারে মুদ্রাস্ফীতি, বাণিজ্য ঘাটতি এবং টাকার দামের উপর। তেলের দাম দীর্ঘ সময় চড়া থাকলে পরিবহণ ও উৎপাদনের খরচ বাড়ার সম্ভাবনাও থাকে।
রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের সমীক্ষার উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপরিশোধিত তেলের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে মুদ্রাস্ফীতির সূচক প্রায় ২০ বেসিস পয়েন্ট বাড়তে পারে। ফলে তেলের বাজারের দিকে নজর রাখতে হচ্ছে কেন্দ্র এবং আরবিআই— দু’পক্ষকেই।
আরও একটি সমস্যা হল বিশ্বজুড়ে সুদের হার ও সরকারি ঋণের চাপ। আমেরিকার বিপুল ঋণ এবং বন্ডের বাজারে বাড়তে থাকা সুদের হার নিয়ে ইতিমধ্যেই উদ্বেগ রয়েছে। তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি যদি সুদের চাপও বাড়ে, তা হলে বিনিয়োগ ও শেয়ারবাজারে তার প্রভাব পড়তে পারে।
তবে পরিস্থিতির অন্য দিকও রয়েছে। পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী না হলে এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে সরবরাহ স্বাভাবিক হলে তেলের দাম ফের নীচে নামতে পারে। ফলে বর্তমান ১০৮ ডলারের দামকে সরাসরি বিশ্ব মন্দার নিশ্চিত সংকেত বলা এখনও ঠিক হবে না।
ভারতের ক্ষেত্রে অবশ্য জ্বালানি আমদানির খরচ, মুদ্রাস্ফীতি এবং টাকার দামের উপর নজর রাখা জরুরি। আগামী দিনে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের পরিবর্তে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ে এবং তেল উৎপাদনকারী ব্রিক্স দেশগুলির সঙ্গে সেই ব্যবস্থা কার্যকর হয়, তা হলে দীর্ঘমেয়াদে ভারতের জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধা তৈরি হতে পারে।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?।