শঙ্খচূড় এখন এভারেস্টের পাদদেশে?
তাপমাত্রা বাড়ছে ধীরে ধীরে, বরফ গলছে চুপিসারে, আর সেই সঙ্গে বদলে যাচ্ছে প্রাণীকুলের বাসস্থানও। হিমালয়ের চূড়ার নিচে, যেখানে শীতের কামড় এতটাই কড়া যে শীতল রক্তের প্রাণীরা সেখানে প্রায় অদৃশ্য, সেই এলাকা থেকেই সম্প্রতি একের পর এক বিষধর সাপের খোঁজ মিলছে। ভয়াল সেই বিষধর প্রাণীটি আর কেউ নয়, শঙ্খচূড়—অর্থাৎ কিং কোবরা। সঙ্গে ছিল পদ্মগোখরোরও উপস্থিতি। পরিবেশবিদ ও সর্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ঘটনা নিছক আকস্মিক নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের এক ভয়ঙ্কর ইঙ্গিত।
ধরাবাঁধা আবাস ছেড়ে এখন নতুন অঞ্চলে ঠাঁই নিচ্ছে সাপেরা। সাধারণত ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ফিলিপিন্সের গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চল ও ম্যানগ্রোভ বনে দেখা মেলে শঙ্খচূড়ের। ঠান্ডা সহ্য না হওয়ায় পাহাড়ি উচ্চতায় এদের উপস্থিতি খুবই বিরল। অথচ সম্প্রতি এভারেস্টের আশেপাশের গ্রামাঞ্চলে একের পর এক শঙ্খচূড় এবং পদ্মগোখরোর দেখা মিলেছে। ‘কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে ১০টি কোবরা সাপ উদ্ধার করা হয়েছে—তার মধ্যে রয়েছে ডিম সহ বাসা পর্যন্ত!
এই বিষধর সাপদের দেখা মিলেছে গোপালেশ্বর, ভাঞ্জিয়াং, সোখোল, ফুলচকের মতো পাহাড়ি গ্রামে। ভয়টা আরও বেড়েছে এই কারণে যে বেশ কিছু সাপ বাড়ির ভিতরে কিংবা উঠোনে ঢুকে পড়েছিল। পরে স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে তাদের জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞ সুবোধ আচার্য বলছেন, কাঠ, খড় নিয়ে আসার ট্রাকে সাপগুলি উপত্যকায় চলে এসেছে হয়তো। তবে অবাক করা বিষয়—তারা পাহাড়ি ঠান্ডা পরিবেশে টিকে থাকতেও শিখে ফেলেছে।
উষ্ণায়নের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এর পেছনে মূল কারণ বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। হিমালয়ের তাপমাত্রা প্রতি বছর ০.০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস করে বাড়ছে। হিমবাহ গলছে, বর্ষার মরসুম দীর্ঘতর হচ্ছে, বৃষ্টিপাত অনিয়মিত হচ্ছে। আর্দ্র পরিবেশে ঠান্ডা রক্তের প্রাণীরা যেমন সাপ, তারা নতুন বাসস্থানের খোঁজে উঠে আসছে উঁচুতে। পরিবেশবিদদের মতে, এই পরিবর্তন শুধু বাসস্থান বদলের নয়, খাদ্যচক্র, প্রজনন, এমনকি শিকার ধরার কৌশলেও বদল আনছে সাপেরা।
তবে এই ঘটনাকে অতিসরলীকরণ করতেও নারাজ অনির্বাণ রায়চৌধুরী। তাঁর মতে, শুধু উষ্ণায়নের জন্যই যে শঙ্খচূড় পাহাড়ে উঠে আসছে, তা বলা যায় না। বরং এটি একটি বহুদিনের পর্যবেক্ষণ-নির্ভর প্রবণতা। ভারতের সিকিম, উত্তরাখণ্ড, এমনকি অরুণাচল প্রদেশের দুই-আড়াই হাজার মিটার উচ্চতাতেও এর আগে শঙ্খচূড়ের অস্তিত্ব মিলেছে। নেপালের ৭৭টি জেলার মধ্যে ৪১টিতেই আজ শঙ্খচূড়ের দেখা মেলে, যার অনেকগুলি পাহাড়ি এলাকা।
এই বিষধর সাপের উপস্থিতি নেপালের জনস্বাস্থ্যেও নতুন করে আশঙ্কা তৈরি করেছে। প্রতি বছর তরাই অঞ্চলে সাপের কামড়ে গড়ে ২৭০০ জন মারা যান—তাঁদের মধ্যে বড় অংশ নারী ও শিশু। তাই পাহাড়ি জেলাগুলিতে এখন স্থাপন করা হচ্ছে সাপে কামড়ের চিকিৎসাকেন্দ্র।
উষ্ণায়নের ফলে শুধু মানুষ নয়, পরিবেশের প্রতিটি স্তরে বাড়ছে অনিশ্চয়তা। শঙ্খচূড়ের পাহাড়ে উঠে আসা যেন সেই বিপদের এক তীব্র সঙ্কেত—একটা শীতল সতর্কবার্তা, যা আর অবহেলা করা চলে না।
স্মৃতি ধরে রাখার জাদু: মস্তিষ্কে অ্যাসিটোকোলিন সচল রাখতে রোজকার অভ্যেসে আনুন এই পাঁচ পরিবর্তন