হিজাব আইন অমান্যকারীদের জন্য
ইরানে বাধ্যতামূলক হিজাব আইন অমান্য করা মহিলাদের জন্য মনোচিকিৎসা প্রদানের নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ইরানের নারী ও পরিবার সংক্রান্ত বিভাগের প্রধান মেহরি তালেবি দারেস্তানি জানিয়েছেন, হিজাব না পরা মহিলাদের জন্য বিশেষ মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র খোলা হবে। সেখানে তাঁদের “বিজ্ঞানসম্মত ও মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা” দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। ইরানের সংবাদমাধ্যমে এই খবর প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই বিষয়টি ঘিরে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।
ইরানের কঠোর হিজাব আইন ও প্রতিবাদ
ইরানে মহিলাদের জন্য হিজাব পরা বাধ্যতামূলক। এটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের অন্যতম কঠোর পোশাক বিধি। প্রকাশ্যে মহিলাদের মাথা ঢেকে রাখা এবং ঢিলেঢালা পোশাক পরা বাধ্যতামূলক। আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি প্রয়োগ করা হয়। ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর ঘটনা এই আইনের কঠোরতা তুলে ধরে। মাহসাকে হিজাব আইন ভঙ্গের অভিযোগে গ্রেফতার করে নীতি পুলিশ। পুলিশি হেফাজতে তাঁর মৃত্যুর পরে ইরান জুড়ে বিক্ষোভের ঝড় ওঠে। এই ঘটনাটি বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় তোলে।
মনোচিকিৎসাকেন্দ্র নিয়ে বিতর্ক
ইরান সরকারের নতুন এই মনোচিকিৎসার উদ্যোগকে বিরোধীরা কটাক্ষ করেছেন। সমালোচকরা বলছেন, হিজাব-বিরোধী অবস্থানকে “মানসিক অসুস্থতা” হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে সরকার। এটি শুধুমাত্র বিরোধীদের দমন করার একটি পদ্ধতি বলে অভিযোগ করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা। ব্রিটেনে কর্মরত ইরানি সাংবাদিক সিমা সাবেত এই উদ্যোগকে “ভয়ঙ্কর” বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, এটি মহিলাদের অধিকার হরণের একটি নতুন রূপ, যেখানে চিকিৎসার আড়ালে ভয় দেখানো হচ্ছে।
হিজাব না পরার জন্য গ্রেফতার ও মানসিক চিকিৎসা
সম্প্রতি, তেহরানের ইসলামিক আজ়াদ বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া আহু দারইয়াই হিজাব আইন ভঙ্গ করার জন্য আলোচনায় আসেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অন্তর্বাস পরে হাঁটার মাধ্যমে এই আইনের প্রতিবাদ জানান। পরে তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং মানসিক রোগী হিসেবে চিহ্নিত করে একটি মনোচিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানো হয়। এমনকি, অতীতে এক কুর্দিশ র্যাপারকেও হিজাব-বিরোধী অবস্থানের জন্য গ্রেফতার করে মানসিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে শারীরিক এবং মানসিকভাবে নির্যাতনের মাধ্যমে তাঁর কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
মানবাধিকার সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে। বিশেষ করে, মহিলাদের হিজাব না পরার জন্য মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। এ ধরনের পদক্ষেপকে একাধিক মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, এটি কেবল ইরানের অভ্যন্তরীণ বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করার কৌশল।
ইরানে হিজাব আইন এবং ভবিষ্যতের সংকট
ইরানের বর্তমান কঠোর অবস্থান দেখে বোঝা যাচ্ছে, হিজাব আইন নিয়ে বিরোধিতার কারণে সরকারের চাপে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ ইরানের প্রশাসনিক সংকটকে আরও বাড়াবে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই আইনের বিরোধিতা বেড়েই চলেছে। প্রতিবাদের বিভিন্ন নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে, যা ইরানের সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
ইরানের হিজাব আইন এবং এই মনোচিকিৎসার উদ্যোগ দেশটির সমাজ ও রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই সিদ্ধান্ত ইরানের ভাবমূর্তিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।